Breaking News
Home / নির্বাচিত লেখা / কুরআনের সংখ্যাগত বিশ্লেষণ -১৯!

কুরআনের সংখ্যাগত বিশ্লেষণ -১৯!


কুরআনের সংখ্যাগত বিশ্লেষণঃ
বলতে বোঝায় আরবি ভাষায় লিখিত এই ধর্মগ্রন্থে বিভিন্ন সংখ্যার পুন:পৌণিক ও তাৎপর্যময় উপস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠনের করা দাবী এবং উক্ত দাবীর সত্যতা নির্ধারণে সম্পাদিত কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের শব্দবিন্যাসের ব্যকরণগত ও গাণিতিক বিশ্লেষণ ।সর্বসমক্ষে কুরআনের সাংখ্যিক তাৎপর্যের এই দাবীটি সর্বপ্রথম করেন রাশাদ খালিফা নামে পরিচিত একজন মিশরীয় ধর্মসংস্কারক । তিনি প্রধানত: ১৯ সংখ্যাটির কৌতূহলোদ্দীপক পুন:পৌণিক উপস্থিতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।পরবর্তীতে ১৯ ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি সংখ্যার প্রধান্যের বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
১৯ সংখ্যা
কুরআনের আদি তাফসীরকারকগণ এই উনিশ সংখ্যা সম্পর্কে অনেক সুন্দর সুন্দর ধারণা করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন এই উনিশ হচ্ছে দোযখ নিয়ন্ত্রণকারী উনিশ জন ফেরেশতা। [২] এবং অনেকে ইসলামের ঊনিশটি প্রধান স্তম্ভ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাফসির কারক গন এই বলে তাদের কথা শেষ করেছেন যে এই সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তায়ালাই ভাল জানেন। অর্থাৎ তারা ১৯ সংখ্যা দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। কারণ ইসলামের নবী(সা) এই উনিশ সংখ্যা সম্পর্কে আসল অবস্থা বর্ণনা করেননি। বলা হয়ে থাকে এই উনিশ সংখ্যাটির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফের আসল রচয়িতা যে তিনি তা প্রকাশ করেছেন। কেননা যদি মুহাম্মদ(সা) নিজে কুরআন রচনা করতেন তাহলে তিনি এই উনিশ সংখ্যা দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে তা ব্যাখ্যা করে যেতেন।
কুরআন নাযিল হওয়ার ধারাবাহীকতা থেকে আমরা দেখতে পাই সূরা মুদ্‌দাসসির এর ৩০ নং আয়াতটি চতুর্থ বারের সময় মুহাম্মদ(সা) এর নিকট নাযিল হয়।
“ ইহার উপর আছে উনিশ ”
সূরা মুদ্‌দাসসির এর ৩০ নং আয়াত নাযীল করে জিব্রাইল কিছুক্ষণ নীরব থাকেন এবং এই সুরার বাকী ১৪ টি আয়াত নাযিল না করে তিনি চলে যান সেই সুরা আল-আলাকে, যার ১ম ৫টি আয়াত সর্বপ্রথম নাযিল করা হয়েছিল। সুরা আল-আলাকে বাকী ১৪টি আয়াত এই সময় নাযিল করা হয়, তাহলে প্রথমে নাযিল করা সুরাটিতে আয়াত সংখ্যা হল (৫+১৪=১৯) ।
• মুহাম্মদ (সা) এর ওপর প্রথম নাযিল হয় আল-আলাকের ১ম ৫টি আয়াত গণনায় দেখা যাবে যে তার শব্দ সংখ্যা ১৯।
• ১৯ টি শব্দের অক্ষর গুলোর যোগফল ৭৬ যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
• সুরা আল-আলাক কুরআন শরীফের পিছন দিক দিয়ে ১৯ নং সুরা।
• মুহাম্মদ (সা) এর ওপর সর্বশেষ নাযিল হওয়া সুরা নাসর যার শব্দ সংখ্যা ১৯।
• কুরআন শরীফের মোট সুরা সংখ্যা ১১৪ যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
• কুরআন শরীফের ১ম বাক্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম যাতে মোট অক্ষর সংখ্যা ১৯।
• “বিসমি” কুরআনে মোট ১৯ বার উল্লেখ করা আছে।
• পরবর্তি শব্দ “আল্লাহ” উল্লেখ আছে ২৬৯৮ বার যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। এতে ভুল রয়েছে আসলে আল্লাহ শব্দটি আছে ২৬৯৯ যার ১৯ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ এক থাকে
• কুরাআনে রব শব্দ ৯৭০ বার আছে যা ১৯ দারা ভাগ করলে ১ অবশিষ্ট থাকে।
• কুরআনে ইলাহ শব্দ ৯৬ বার আছে যা ১৯ দারা ভাগ করলেও ১ অবশিষ্ট থাকে।
• পরের শব্দ “রাহমান” আছে ৫৭ বার যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
• পরের শব্দ “রাহীম” আছে মোট ১১৪ বার যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। এটাও ভুল প্রমানিত হয়েছে রাহিম শব্দ ১১৫ বার আছে যা ১৯ দিয়ে ভাগ করলেও ১ অবশিষ্ট থাকে।
• সুরা ফাতিহা পড়লে ঠেট ১৯ বার এক জায়গায় হয় ।
রাশাদ খলিফার সমালোচনা
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ‌‌স্কেপটিকাল এনকুইরার পত্রিকায় রাশাদ খলিফার বিশ্লেষণ যে ত্রুটিপূর্ণ তা উল্লেখ করে “কোরানের কৌশলী পাঠ” বলে প্রথম সমালোচনামূলক মন্তব্য প্রদান করেন আমেরিকার গণিতবিদ-বিজ্ঞানী মার্টিন গার্ডনার। বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিল থেকে জানুয়ারী ২০১০ সালে প্রকাশিত যুক্তি পত্রিকায় এই ১৯ তত্ত্বের বিস্তৃত সমালোচনা ছাপা হয়েছে। সৈকত চৌধুরী এবং অনন্ত বিজয় দাশ লিখিত এই প্রবন্ধে রাশাদ খলিফার ১৯ তত্ত্বের বিভিন্ন দুর্বলতা ও বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং একে খলিফার ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ইন্টারনেটে অন্যান্য সমালোচনাকারীরা রাশাদ খলিফার এই সাংখ্যিক তাৎপর্য-এর পুরো ব্যাপারটিকে বিভ্রান্তিকর এবং ছলনা হিসেবে উল্লেখ করেন । তাদের মতে, অসংখ্য অপশন থেকে খলিফা উনিশ দ্বারা বিভাজ্য প্রমান করা যায় এমন অপশনগুলো গ্রহণ করেছেন- বাকিগুলো ফেলে দিয়েছেন। যেমন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাক্যে যে ১৯টি বর্ণ আছে, এই মৌলিক দাবী সংশয়মুক্ত নয়। আরবি বাক্যটিকে ইংরেজিতে প্রতিবর্ণীকরণ করার সময় আমরা যদি স্বরবর্ণ বাদ দেই, তাহলে বাক্যটি এরকম দাঁড়ায়: “BSM ALLH ALRHMN ALRHIM”, উল্লেখ্য আরবিতে স্বরবর্ণগুলো লেখা হয় না, পড়ার সময় ধরে নেয়া হয়। এই প্রতিবর্ণীকৃত বাক্যে বর্ণের সংখ্যা ১৯। কিন্তু, আরবিতে “তাশদিদ” বলে একটি প্রতীক আছে, কোন বর্ণের উপর সে প্রতীক থাকলে তা দুই বার উচ্চারণ করতে হয়। “ALLAH” শব্দের দ্বিতীয় “L” এর উপর একটি তাশদিদ আছে। সেক্ষেত্রে এই লাম দুইবার উচ্চারণ করে এভাবে লেখা যেত (বা এভাবে লেখা উচিত): “ALLLAH”; আর বর্ণ সংখ্যা হয়ে যেত ২০টি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] যেমন, AL-RaHIM শব্দের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে – ডঃ খালিফা বলেছেন, এই শব্দ মোট ১১৪ (৬ X ১৯) বার এসেছে। কিন্তু আবদুল-বাকির নির্ঘণ্ট অনুসারে কুরআনে এই শব্দটি হুবহু এই রূপে মাত্র ৩৪ বার উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ এই ৩৪ স্থানেই শব্দের আগে “AL” নামক ডেফিনিট আর্টিক্‌লটি আছে। কিন্তু বাকি ৮১ স্থানে শব্দের আগে কোন ডেফিনিট আর্টিক্‌ল নেই। এখন আর্টিক্‌ল সহ এবং ছাড়া সবগুলোই যদি আমরা গণনা করি, তাহলে মোট সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১১৫। এক বার এর বহুবচনও উল্লেখিত হয়েছে। তাহলে মোট ১১৬ হয়ে যাচ্ছে। ১১৫ এবং ১১৬, কোনটিই ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।তবে এক বচনে ১১৫ বার হওয়ায় অর্থাৎ ১ অবশিষ্ট থাকায় রহমানের একত্ব প্রকাশ পাওয়া যায় বলে মনে হয় ।
সমালোচনাকারীরা আরো বলেন, রাশাদ খলিফার কোরানে তিনি উনি ১৯ তত্ত্বকে সার্থকতা দিতে গিয়ে ৯:১২৮ এবং ৯:১২৯ – এই আয়াতগুলো বাদ দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। অথচ যে কোন সাইটের কোরানের অনুবাদে উক্ত আয়াতগুলো পাওয়া যায়। এছাড়া রাশেদ নিজের ইংরেজি অনুবাদকৃত কোরানের ‘সুরা ফুরকান’, ‘সুরা ইয়াসিন’, ‘সুরা শুরা’ এবং ‘সুরা তাক্ভির’-এর আয়াতে নিজের নাম পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিয়ে তাঁর বক্তব্যের ‘ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা’ আদায়ের চেষ্টা করেছেন। যেমন –
We have sent you (Rashad) as a deliverer of good news, as well as a warner. [25:56] ইত্যাদি
এই ভন্ড খলিফা নিজেও বহু জায়গায় নিজেকে ‘আল্লাহর ম্যাসেঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং দস্তখত দিয়েছিলেন । খলিফার নিজেকে ‘আল্লাহর ম্যাসেঞ্জার’ হিসাবে দাবির বিষয়টি ইসলাম অ্যাওয়ারনেস ও নলেজরাশ সহ কয়েকটি ওয়েবসাইটে সমালোচিত হয়েছে ।
সাংখ্যিক তাৎপর্যের সমালোচনা
“সাংখ্যিক তাৎপর্য” ব্যাপারটিও সর্বজনগ্রাহ্য বিষয় নয় বলে বহু গবেষক মনে করেন। বহুক্ষেত্রেই গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, মূলতঃ নির্বাচনী বায়াস থেকে সাংখ্যিক তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করা হয়। এটা হতে পারে অন্য ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রেও। যেমন, রুশ বংশোদ্ভুত গণিতবিদ এবং খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক ড. ইভান পেনিন (১৮৫৫-১৯৪২) একদা দাবি তুলেছিলেন বাইবেল ‘ধর্মগ্রন্থটি ৭ সংখ্যা দ্বারা চমৎকারভাবে আবদ্ধ’। কেউ আবার ১২ এর সাথে বাইবেলের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে ইহুদিদের বিখ্যাত শেমহামেফোরাস (Shemhamphorasch)। এক্সোডাসের ১৪:১৯-২১, এই তিনটি আয়াতের মাধ্যমে তারা স্রষ্টার ৭২টি নাম উদ্ভাবন করেছে। ইহদীরা দাবী করে এই প্রতিটি আয়াতে ৭২টি করে বর্ণ আছে। কাজেই কোরাণের ১৯-এর সাংখ্যিক তাৎপর্য কোন আলাদা গুরুত্ব দাবী করে না। গবেষকেরা আরো দেখিয়েছেন ইচ্ছে করলেই যে কোন সংখ্যাকে অলৌকিক কিংবা তাৎপর্যময় সংখ্যা হিসবে হাজির করা যেতে পারে। যেমন, যেমন, ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আমেরিকায় ঘটে যাওয়া ৯/১১ এর ঘটনার ব্যাপারে টুইন টাওয়ারে হামলার তারিখ (৯+১+১=) ১১, ১১ই সেপ্টেম্বর বছরের ২৫৪তম দিন, এই হিসেবে (২+৫+৪ =) ১১, ১১ই সেপ্টেম্বর পর বছর শেষ হতে ১১১ দিন বাকি… সেখান থেকে শুরু করে টুইন টাওয়ার 11 এর মত দেখতে, “New York City”, “Afghanistan”, “the Pentagon” … ইত্যাদি সব কিছুতেই ১১টি শব্দ উল্লেখ করেই সাংখ্যিক তাৎপর্য খোঁজা যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারগুলোকে গণিতবিদ জন এলেন পাউলোস তার Irreligion বইয়ে “আফটার দ্য ফ্যাক্ট – কোইন্সিডেন্স” (After the fact coincidence) বলে উল্লেখ করেছেন।[২১] কারণ বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাবে অনেক কিছুই আবার ১১ এর সাথে সম্পর্কহীন; যেমন, হামলার বছর ২০০১=> ২+০+০+১= ৩ (১১ নয়), হামলার সময়ে ৪ টি (১১টি নয়) বিমান যুক্ত ছিলো, বিমানে লোকের সংখ্যা ছিলো ২৬৬=> ২+৬+৬=১৪ (১১ নয়), একটি প্লেন এর নাম্বার ৭৬৭ => ৭+৬+৭=২০ (১১ নয়), আরেকটি প্লেন এর নাম্বার ৭৫৭ => ৭+৫+৭= ১৯ (১১ নয়) ইত্যাদি। সাধারণ সমস্ত ঘটনায় এ ধরণের সাংখ্যিক তাৎপর্য খোঁজার প্রয়াস নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে বহুভাবে সমালোচিত হয়েছে, অপবিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

তথ্য সুত্রঃ উইকিপেডিয়া

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন