সোমবার , সেপ্টেম্বর 16 2019
Breaking News
Home / বিশেষ লেখা / প্রসঙ্গ: ‘ঈদ’ ও ‘ইদ’

প্রসঙ্গ: ‘ঈদ’ ও ‘ইদ’

বাঙলা বানান বিধি’পুঁথিযোগে পরেশচন্দ্র মজুমদার যা লিখেছেন–

” প্রথমেই মনে রাখা দরকার, সংস্কৃত শব্দে হ্রস/দীর্ঘ ভেদ আছে। বাঙলাতেও আছে। কিন্তু উভয়ের গুনগত পর্থক্য যথেষ্ট। সংস্কৃতে এই গুরু-লঘু ভেদ শব্দের অর্থান্তর ঘটয়। যেমন– দিন: দীন, চির: চীর, কুল: কূল ইত্যাদি। কাজেই সংস্কৃতে হ্রসদীর্ঘভেদ ধ্বনিমানসূচক (Phonemic)। বাঙলা শব্দের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তণ অবস্থান মূলক অর্থাৎ স্বরের অবস্থান অনুযায়ী এই ভেদ ঘটে। যেমন– তিন, হিম, চিল’ ইত্যাদি শব্দের ই-কার উচ্চারণে দীর্ঘ, কিন্তু রিপু, ভীষণ ইত্যাদি শব্দে ই-স্বর হ্রস। লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে স্বর রুদ্ধ (Closed), কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা মুক্ত (Open)। কিন্তু লক্ষণীয়, অবস্থান অনুযায়ী বাঙলা স্বরমাত্রার হ্রস-দীর্ঘভেদ থাকলেও এর বিপর্যয় অর্থান্তর ঘটায় না। কাজেই বাঙলায় এই ভেদ ধ্বনিমান সূচক (Phonemic) নয়। প্রকৃতপক্ষে বাঙলার যথার্থ প্রবণতা হলো হ্রস মাত্রার উচ্চারণ। উচ্চারণে এবং বানানে সমতা আনা উচিত।” (বাঙলা বানানবিধি, পৃ:২৮)

ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘বাঙ্গালা বানান সমস্যা’ নামে এক প্রবন্ধ বের করেছিলেন ১৩৩১ সালে। প্রবন্ধে তিনি লেখেন–

” বাংলার সকল শব্দই উচ্চারণ অনুযায়ী লিখিতে হইবে।” তার বক্তব্যে ছিলো– শ্রবণ করা অর্থে বাংলায় ‘শোনা’ শব্দ লেখা হয়। কিন্তু, স্বর্ণ অর্থে তা কেন ‘শোনা’ লেখা হবে না? একটি উত্তর– সংস্কৃত স্বর্ণ শব্দে ‘স’ আছে, তাই, ‘সোনা’ লেখাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন ‘সোনা’ শব্দের উচ্চারণ তো ‘শোনা’। তাই ‘শোনা’ লেখাই উচ্চারণের বিচারে স্বাভাবিক। তখন আপত্তি উঠেছে ‘স্বর্ণ’ আর ‘শ্রবণ করা’ দুই অর্থ, দুই ভাব। ভাবে তফাত বজায় রাখতে হলে বানানের তফাত রাখা দরকার আছে। ‘স্বর্ণ’ অর্থের ব্যঞ্জনা আর ‘শ্রবণ করার’ ব্যঞ্জনা কি এক জিনিস? উভয়ের সার্থকতা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এক ‘শোনা’ শব্দে দুই ভাব হবে কী করে? অতএব, ‘শোনা’ আর ‘সোনা’ দুই বানানই রাখতে হয়।

কথা হচ্ছে– ‘ঈদ’ বা ‘ইদ’ এ দুই বানানে কি ভিন্ন অর্থের ব্যঞ্জনা তৈরি করে? যদি তা না হয়, তবে এক্ষেত্রে উচ্চারণকে প্রাধান্য দেয়াই উচিত। কেননা ‘ঈদ’কে হানিফ সংকেতসহ দুয়েকজন ছাড়া কেউ আর বর্তমানে লম্বা টান দিয়ে বলেন না ‘ই-ই-দ’। সবাই (অধিকাংশ ক্ষেত্র) বলার সময় উচ্চারণের দিক দিয়ে ‘ইদ’ই বলে। তাছাড়া বিদেশি শব্দেই দীর্ঘ-ঈ আগেই বাদ দেয়া হয়েছে। জ, স এর ক্ষেত্রে দেখা যায় বাঙলায় প্রচলিত বিদেশী শব্দ সাধারণভাবে বাঙলা ভাষায় ধ্বনি পদ্ধতি অনুযায়ী লিখতে হয়। যেমন– কাগজ, জাহাজ, হাসপাতাল, ফিরিস্তি, হাজার, বাজার, জুলূম, জেব্রা।

কিন্তু ইসলাম ধর্ম সংক্রান্ত কয়েকটি বিশেষ শব্দে ‘যে’, ‘যাল’, ‘যোয়াদ’ রয়েছে যার ধ্বনি ইংরেজি Z এর মতো। সেক্ষেত্রে উক্ত আরবি বর্ণগুলির জন্যে ‘য’ ব্যবহার হওয়া সঙ্গত। যেমন– আযান, এযিন, ওযু, কাযা, নামায, যোহর, রমযান। তবে কেউ ইচ্ছে করলে এক্ষেত্রে ‘য’ এর পরিবর্তের ‘জ’ ব্যবহার করতে পারেন। জাদু, জোয়াল, জো ‘জ’ লেখা বাঞ্ছনীয়।

এ বিষয়ে সক্রিত নোমানের স্ট্যাটাসে চমৎকৃতভাবে গবেষণামূলক একটি ব্যাখ্যা পরিলক্ষিত হয়। ব্যাখ্যাটি নিম্নরূপ :

” আরবিতে ঈদ লেখা হয় আইন-ইয়া-দাল অর্থাৎ ঈদ বানান আরবি হরফ ‘আইন’ দিয়ে শুরু, মাঝে ‘ইয়া’, তারপর ‘দাল’। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দের দ্বিতীয় অক্ষর ‘ইয়া’ হলে তার উচ্চারণ সব সময় দীর্ঘ হয়ে থাকে। অর্থাৎ ‘ঈদ’ এর উচ্চারণ লম্বা করে ‘ঈদ’ হবে, কোনোভাবেই ‘ইদ’ নয়। ‘ইদ’ হতো যদি ‘আইন’ এর নিচে ‘জের’ দিয়ে তারপর ‘দাল’ দেওয়া হতো। আমরাও ‘ঈদ’ লিখতে অভ্যস্ত। কিন্তু কেউ যদি ‘ইদ’ লিখেন, তাও ভুল হবে না। কারণ আরবি শব্দকে আমরা পুরোপুরি ‘মাখরাজ’ বা ব্যকরণ মেনে বাঙলায় উচ্চারণ করি না। করতে আমরা বাধ্য নই। কেননা, বাংলাদেশ আরবের উপনিবেশ নয়। বেশিরভাগ আরবি শব্দকে আমরা আমাদের মতো উচ্চারণ করি। যেমন– ‘রহিম’ নামে আরবিতে কোনো শব্দ নেই। আছে রাহিম। আরবির রাহিম বাঙলায় রহিম হয়ে যায়। আরবির কামারুজ্জামান বাঙলায় কামারুজ্জামান, আরবির রমাদান বাঙলায় রমজান, আরবির আল্লাহু আকবার বাঙলায় আল্লাহু আকবর, আরবির দেলাওয়ার বাঙলায় দেলোয়ার হয়ে যায়। এরকম বিস্তর উদাহারণ দেয়া যাবে।”

রাহিমকে রহিম বলতে আপত্তি নেই, ঈদকে ইদ বলতে আপত্তি কোথায়? যদিও আমরা বলার সময় ইদ’ই বলি। ফেসবুকে বিভিন্নজনের স্ট্যাটাস মোতাবেক ‘বাঙলা একাডেমি’র নতুন বানানরীতি অনেকেই মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্য– বাপ-দাদার আমল থেকে যে বানানের সাথে পরিচিত, সে বানান ভুলে নতুন বানানে অভ্যস্ত হতে চাই না।
একই ভাষ্য ছিলো আবু লাহাব, আবু জাহেলসহ আরবের পৌত্তলিক ধর্মের বহু অনুসারীদের। তারা বলেছিলেন– বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে তোমার সংস্কার ধর্মে বিশ্বাস আনতে পারবো না। তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসেনি। অনেকেই বিশ্বাস এনেছিলো। যারা আনেনি, তারা বিতর্কিত থেকে গেছে।

আপনি নতুন বানানরীতি মানতে চান না, ভালো কথা। কিন্তু আমার প্রশ্ন– বানানরীতিতে কি এই প্রথম পরিবর্তণ এসেছে, যে এভাবে এর বিরোধীতা করছেন? গাড়ি, বাড়ি, দাড়ি, দাদি, জমিদারি, জাপানি, জার্মানি, টুপি, তরকারি, নিচু, পঞ্চমি, পাগলামি, পাগলি, পিসি, ফরাসি, ফরিয়াদি, বর্ণালি, বাঁশি, বেশি, মাসি, মালি, মাস্টারি, হাতি, হিজরি, হিন্দি, হেঁয়ালি, এসব বানানে কি এখনও দীর্ঘ-ঈ কার ব্যবহার করেন? যদি এসব বানান সংস্করণে আপত্তি না থাকে ‘ঈদ’ থেকে ‘ইদ’ সংস্করণে আপত্তি কেন? অতীতে বহু বানানেই সংস্করণ ঘটেছে। আশাকরি উদাহরণ দিতে হবে না। বাঙলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করেই লিখে থাকেন বর্তমান পণ্ডিতগণ। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে ‘ইদ’ বানানটিই প্রচলিত হবে। তখনকার প্রজন্ম তাদের (আজকে যারা বিরোধীতা করছেন) নিয়ে হাসাহাসি করবে। সেই চর্যাকাল থেকেই ভাষার বিবর্তণ ঘটছে, ঘটবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রসিদ্ধ ‘বাংলা ব্যাকরণ’ প্রবন্ধে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ ও তীব্র ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলেছিলেন– ” মাকে মা বলিয়া স্বীকার না করিয়া প্রপিতামহীকেই মা বলিতে যাওয়া দোষের হয়। সেইরূপ বাংলাকে বাংলা না বলিয়া কেবলমাত্র সংস্কৃতকেই যদি বাংলা বলিয়া গণ্য করি, তবে তাহাতে পাণ্ডিত্য প্রকাশ হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় থাকে না।” (বাংলা শব্দতত্ত্ব, পৃ:১১২)

পবিত্র সরকার মহাশয়ও রবীন্দ্রনাথের বৃত্তি করে লিখেন– ” সংসদ বাঙ্গলা অভিধান’ এর সম্পাদক মাঝেমাঝে বাংলা ‘ঈ’-প্রত্যয় জুড়ে শব্দ তৈরি করেছেন, যেমন– ‘অদরকারী’। মনে রাখতে হবে এসব প্রত্যয় তৈরি হয়েছে মুখের ভাষায়, আর মুখের ভাষায় দীর্ঘ-ঈ বলে কিছু নেই। সুতরাং ওটা সোজাসুজি ই-প্রত্যয়।” (বাংলা বানান সংস্কার; সমস্যা ও সম্ভাবনা, পৃ: ১৫১)

বহুপূর্বেই মনীষীগণ দীর্ঘ-ঈ প্রত্যয় বাদ দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ আলোচনা নতুন নয়। বর্তমানে ‘বাঙলা একাডেমি’ তাদের ইচ্ছাটাকে বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র। তবে আমার মতে তা অনেক আগেই করা উচিত ছিলো। বাঙলা একাডেমিতে যারা ‘বানান বিষয়ক গবেষণামূলক’ কাজে নিযুক্ত, তারা কেউ’ই শিক্ষাদীক্ষায়-জ্ঞানগরীমায় আমাদের থেকে কম পণ্ডিত নন। অনেক ভেবেচিন্তে গবেষণা করেই এ সিদ্ধান্তে এসেছেন– ঈদ নয়, ইদ। আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন, যারা ‘ঈদ’কে ‘ইদ’ মানেন না। তাদের মানায় না মানায় বাঙলা একাডেমির কিছু যায় আসে না। বাঙলা একাডেমি তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যাবে। যারা মানেন না, তারা বিতর্কিত হয়েই থাকবেন। কেউ মানলে মানেন, আর না মানেন– আমি বলবো উচ্চারণের দিক থেকে ‘ঈদ’ নয় ‘ইদ’ই ঠিক। রবীন্দ্রনাথের একটি বিশেষ উক্তি দিয়ে শেষ করছি–

” যেখানে খাস্ বাংলা স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ সেখানে হ্রস-ই কারের অধিকার। সুতরাং দীর্ঘ-ঈ’র সেখান হইতে ভাসুরের মতো দূরে চলিয়া যাওয়াই কর্তব্য। ” (বাংলা শব্দতত্ত্ব, পৃ: ১১২)

আখতার জামান
২২ জুন, ২০১৭
নরসিংদী।

About

Check Also

কথা বলুন মূলদৃশ্য নিয়ে– ইস্যু অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে

নিচের লেখাটি লিখেছিলাম গত বছর তনু-হত্যা নিয়ে যখন দেশ তোলপাড় তখনই ব্যাংক থেকে শতশত কোটি …

মন্তব্য করুন