Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / শেকড়ের সন্ধানে নবান্ন উৎসব

শেকড়ের সন্ধানে নবান্ন উৎসব

আবহমান বাংলার হাজারো বছরের ঐতিহ্য বয়ে চলা কৃষকের উৎসব ‘নবান্ন উৎসব’। প্রতিবছর বাংলার ঋতুর রাণী হেমন্ত এলেই আবহমান বাংলায় ফিরে আসে ‘নবান্ন উৎসব’। ‘কার্তিক-অগ্রহায়ণ’ হেমন্তের এই দুইমাসের অগ্রহায়ণ মাসেই মূলত বাংলার অনন্য এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ‘জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ’ এর আয়োজনে রাজধানীর এই ইট-পাথরের মাঝে অনুষ্ঠিত হলোÑ ‘নবান্ন উৎসব ১৪২৪’। গতকাল ১ অগ্রাহায়ণের দিনভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব।

এই আয়োজনে সংস্কৃতির টানে মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছে রাজধানীবাসী। প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের ব্যস্ত কোলাহলে শেকড়কে ভুলতে বসা তরুণদের দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, লোকজ উপাদানগুলোকে নাগরিক জীবনে আরও বেশি আপন করে নেয়ার প্রত্যয় ধ্বনিত হলো এবারের জাতীয় নবান্নোৎসবে।

চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সকাল সাতটায় গাজী আবদুল হাকিমের বাঁশিতে লোক গানের সুরে শুরু হয় এবারের নবান্নোৎসব। এরপরেই শুরু হয় উৎসবের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। এ আয়োজনে এবারের এ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান উৎসবের উদ্বোধন করেন। ‘নবান্ন কত্থন’ পর্বে তার সঙ্গে অংশ নেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সভাপতি লায়লা হাসান, পর্ষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম, উৎসবের পৃষ্ঠপোষক ল্যাব এইড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. এ এম শামীম।

উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এই নবান্ন উৎসব একটি উদার, সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মানুষের এই উৎসব গণমানুষের উৎসব, খেটে খাওয়া মানুষের উৎসব।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণমুখী, মানবতাবাদী মানুষ হতে গেলে, একটি উদার-নৈতিক সমাজ গড়তে গেলে আমাদের গণমানুষের উৎসব নবান্নে শামিল হতেই হবে।’

গোলাম কুদ্দুছ বলেন, হাজার বছরের চিরায়ত এই উৎসবটি নগরায়ণের প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। নাগরিক তরুণরা আমাদের এই সার্বজনীন উৎসবের সঙ্গে পরিচিত নয়। গ্রামীণ পিঠাপুলি তো তারা অনেকেই চিনে না। তরুণদের শেকড়ে ফেরাতে হলে আমাদের এই গ্রামীণ উপাদানগুলো নগরে আরও বেশি করে তুলে ধরতে হবে।’

লায়লা হাসান বলেন, ‘শেকড়ের এ উৎসবে আমরা লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের পাশাপাশি এই অস্থির সময়ে বাঙালিকে আমরা সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধতে চাই।’

এ আয়োজনের স্বাগত বক্তব্যে সকারের কাছে ‘নবান্ন উৎসবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি এই দিনটিতে সরকারি ছুটির আবেদন জানান’ উৎসব পর্ষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম। তিনি বলেন, ‘বাংলা তারিখকে কেন্দ্র করে এ উৎসবকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদযাপন করা গেলে কৃষি, কৃষকের পাশাপাশি বাংলার অর্থনীতি আরও বেশি উপকৃত হবে।’

উৎসবের সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতেই ছিল সমবেত নৃত্য পরিবেশনা। ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করে নটরাজ। ‘চল যাইতে ধান কাইটা আনিতে’ ও ‘দিন যায় দিন আসে’-গান দুটির সঙ্গে নৃত্যসংগঠন ‘নৃত্যম’-এর শিল্পীরা সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করে। ‘চাষী ভাই আয় রে’ গানের সঙ্গে-নৃত্যজন, লোকজ গানের কম্পোজিশনের সঙ্গে-কাঁদামাটি ও স্পন্দনের শিল্পীরা পরিবেশন করেন সমবেত নৃত্য। আর, সম্মেলক গান পর্বে ‘কাটি ধান কাটি ধান আয় রে’ গান পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বহ্নিশিখা’, ‘মাঠে মাঠে সোনালী ধান’ পরিবেশন করেন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’, ‘সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী’ পরিবেশন করে ‘আমার জমবে মেলা বটতলা হাট’ গানটি।

অনুষ্ঠানে একক পর্বে ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’-লালনগীতি পরিবেশন করেন লালনসম্রাগী শিল্পী ফরিদা পারভীন, শাহী সামাদ শোনান নজরুলগীতি ‘এ কী অপরুপ রুপে মা তোমায়’, সুমা রায় শোনান ‘আমি তোমারই মাটির কন্যা’, শামা রহমান শোনান রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ গানটি। আবৃত্তি পর্বে-নায়লা তারান্নুম কাকলী আবৃত্তি করেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি, শিমুল মুস্তাফা আবৃত্তি করেন সৈয়দ শামসুল হক ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। শেষে গারোদের নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগালা’র ঐতিহ্য পরিবেশন করে নৃত্য সংগঠন পরিবেশন করেন আচিকের শিল্পীরা।

পরে চারুকলা অনুষদ থেকে বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ নিয়ে এক শোভাযাত্রা বের করে নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। শোভাযাত্রাটি টিএসসি মোড় ঘুরে আবার চারুকলায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে চারুকলার বকুলতলায় চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণের শুরু হয় নবান্নের আর্ট ক্যাম্প। এতে অংশ নেন- শিল্পী অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুস শাকুর শাহ, আবুল মান্নান, রেজাউন নবী, কামাল পাশা চৌধুরী, জাহিদ মোস্তফা, অশোক কর্মকার, নাসিমা তুহিনী, হিরন্ময় দাশ, রাশেদুল হুদা-সহ আরও বেশ কয়েকজন জন চিত্রশিল্পী। জলরঙ আর অ্যাক্রেলিকের ক্যানভাসে উঠে আসে গ্রাম-বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গল্প।

সকালের পর্ব শেষে বিকেলেও ছিল নবান্নোৎসবের বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতা। এ আয়োজনে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তির পাশাপাশি ছিল মানিকগঞ্জের চানমিয়ার দলের লাঠি খেলা, নড়াইলের নিখিল চন্দ্রের দলের পটগান, নেত্রকোনার দিলু বয়াতি ও তার দলের মহুয়ার পালা, খুলনার ধামাইল গান। চারুকলা অনুষদ ছাড়াও এই নবান্ন উৎসব উদ্যাপন পর্ষদে আয়োজনে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও অনুষ্ঠিত হয় নবান্নোৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন। সেখানে বিকেল থেকে শুরু হয় এই আনুষ্ঠানিকতা।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন