Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / প্রতিথযশা কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

প্রতিথযশা কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা


সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। সমকালীন বাংলা সাহিত্য এবং এই সময়ের বাঙালি লেখকদের আলোকিত ও আলোচিত এবং গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যে লেখকদের সক্রিয়তা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন তাঁদের অন্যতম। আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যিক সক্রিয়তার ধারাবাহিকতা এই উভয় দিক থেকেই তিনি আমাদের প্রাতঃস্মরণীয়। কিশোরী বয়সেই সাহিত্যভুবনের ডাক শুনতে পেয়েছিলেন তিনি। একজন সাহিত্যিককে এমনিতেই সমাজের প্রতিকূলে সাঁতার কাটতে হয়। সময়টা ১৯৪৮-৪৯ সাল। রাবেয়া খাতুনের দু’চারটে গল্প ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কাগজে ছাপা হয়েছে। কিশোরী রাবেয়ার চোখে তখন স্বপ্ন লেখক হবার। স্বপ্নটা যখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে, তখন রাবেয়া খাতুনের বড় বোনের শ্বশুর বাড়ি থেকে একটি চিঠি আসে। তার বড়বোন লিখেন, “রাবুর হাতের লেখা পত্রিকা অফিসের পরপুরুষেরা দেখে, এজন্য আমাকে গঞ্জনা সহিতে হয়”। কিন্তু তাঁকে দমিয়ে দিতে পারেনি। মা-বাবার হাজারো আপত্তির দেয়াল টপকে সেদিনের সেই কিশোরী মেয়েটি আজ আমাদের দেশের খ্যাতিমান কথা সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় রাবেয়া খাতুনের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যকর্ম বিবেচনায় তিনি একদিকে গ্রামভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজের রূপান্তরের রূপকার এবং অন্যদিকে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিকাশ ও বিবর্তনের দ্রষ্টা। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক প্রতিভার সমন্বয়। ছোটগল্প, ভ্রমণসাহিত্য, স্মৃতিকথামূলক রচনা, শিশুসাহিত্যে তাঁর স্বকীয়তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ও গল্প রচনায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চর্চিত তাঁর বিচিত্র কথাসাহিত্যকর্মে নারী-পুরুষনির্বিশেষে তাঁর সমকালের উল্লেখযোগ্য লেখকদের খুব কম সংখ্যকের মধ্যেই এতটা দীর্ঘকালব্যাপী ধারাবাহিক সক্রিয় ও নিমগ্নতা পাওয়া যাবে। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাবেয়া খাতুনকে এবছর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। আজ এই কথাসাহিত্যিকের ৮২তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনকে লিখালিখি ব্লগের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা।

রাবেয়া খাতুন ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে মামার বাড়ি পাউসার গ্রামেন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি শ্রীনগর থানার ষোলঘর গ্রামে। বাবা মৌলভী মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ, মা হামিদা খাতুন। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে আর দাদা ছিলেন শখের কবিরাজ। সেই সময় কন্যাসন্তান জন্মালে পরিবারের লোকজন খুশি হতো না কিন্তু রাবেয়া খাতুনের জন্মের খবর শুনে তাঁর পরিবারের লোকজন খুব খুশি হয়েছিলেন। পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজারের অলি-গলিতে ও অন্যান্য শহরে কেটেছে তাঁর শৈশবকাল। আরমানিটোলা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (বর্তমানে মাধ্যমিক) পাস করেন ১৯৪৮ সালে। পুরনো ঢাকায় তিনি থেকেছেন প্রায় ১০ বছর। এর মধ্যে তাঁর বাবা এ শহর সে শহর বদলি হয়েছেন। বেশিরভাগ সময় কেটেছে ঢাকার বিভিন্ন ভাড়াটে বাসায়। লেখাপড়া তাঁর ভালো লাগেনি কোনওদিনই। লেখালেখির জন্য ছোটবেলা থেকেই মেনে নিতে হয়েছে বকুনি আর তিরস্কার। তাই এসএসসি পাশ করার পর আর আগ্রহ ছিল না নিজের। পরিবারও আর জোর করেনি। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বিদ্যালয়ের গন্ডির পর তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। রাবেয়া খাতুন ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। রাবেয়া খাতুনের লেখার হাতেখড়ি হয় উপন্যাস দিয়ে। তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাসের নাম নিরাশ্রয়া কিন্তু এই উপন্যাসটি গ্রন্থ আকারে বের হয়নি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস মধুমতী যা তাঁতী সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনের দুঃখগাঁথা নিয়ে রচিত। পরবর্তীতে এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর উপন্যাস দুঃসাহসিক অভিযান, মেঘের পরে মেঘ, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, মহাপ্রলয়ের পর অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মেঘের পরে মেঘ’ সব মহলে সমাদৃত। রাবেয়া খাতুনের অনেক লেখা ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী ও ইরানী ভাষায় অনুদিত হয়েছে। কথসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলোঃ মধুমতী, সাহেব বাজার, অনন্ত অন্বেষা, রাজারবাগ শালিমারবাগ, মন এক শ্বেত কপোতী, ফেরারী সূর্য, অনেকজনের একজন, জীবনের আর এক নাম, দিবস রজনী, সেই এক বসন্তে, মোহর আলী, নীল নিশীথ, বায়ান্ন গলির একগলি, পাখি সব করে রব, নয়না লেকে রূপবান দুপুর, মিড সামারে, ই ভরা বাদর মাহ ভাদর, সে এবং যাবতীয়, হানিফের ঘোড়া, হিরণ দাহ, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, এই বিরল কাল, হোটেল গ্রীন বাটন, চাঁদের ফোটা, নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস, বাগানের নাম মালনিছড়া, প্রিয় গুলসানা, বসন্ত ভিলা, ছায়া রমণী, সৌন্দর্যসংবাদ, হৃদয়ের কাছের বিষয়, ঘাতক রাত্রি, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, মালিনীর দুপুর, রঙিন কাঁচের জানালা, মেঘের পর মেঘ, যা কিছু অপ্রত্যাশিত, দূরে বৃষ্টি, সাকিন ও মায়াতরু, রমনা পার্কের পাঁচবন্ধু, শুধু তোমার জন্য, ঠিকানা বি এইচ টাওয়ার, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, প্রথম বধ্যভূমি, কমলিকা, দশটি উপন্যাস, শঙ্খ সকাল প্রকৃতি, যা হয়না, আকাশে এখনো অনেক রাত, উপন্যাস সমগ্র, স্বনিবার্চিত উপন্যাস, জাগতিক, স্বপ্নে সংক্রামিত, ও কে ছিল, মহা প্রলয়ের পর, নির্বাচিত উপন্যাস, শহরের শেষ বাড়ি, নষ্ট জ্যোস্নার আলো, মাইগো, সমুদ্রবণ ও প্রণয় পুরুষ, এই দাহ, রাইমা ইত্যাদি।

এছাড়া তিনি লিখেছেন জীবন ও সাহিত্য, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, স্মৃতির জ্যোর্তিময় আলোকে যাদের দেখেছি নামক গবেষণামূলক গ্রন্থ, একাত্তরের নয় মাস, স্বপ্নের শহর ঢাকা, চোখের জলে পড়ল মনে স্মৃতিকথা মূলক গ্রন্থ এবং হে বিদেশী ভোর, মোহময়ী ব্যাংকক, টেমস থেকে নায়েগ্রা, কুমারী মাটির দেশে, হিমালয় থেকে আরব সাগরে, কিছুদিনের কানাডা, চেরি ফোঁটার দিনে জাপানে, কুমারী মাটির দেশে অষ্ট্রেলিয়ায়, আবার আমেরিকা, মমি উপত্যকা এবং অন্যান্য আলোকিত নগর, ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ড, হংকং, মালদ্বীপ, পূবের ভূস্বর্গ সোয়াত, তাসমানিয়া নামক ভ্রমণকাহিনী। ছোটদের জন্য তিনি লিখেছেন দুঃসাহসিক অভিযান, সুমন ও মিঠুন গল্প, তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা, একাত্তরের নিশান, দূর পাহাড়ের রহস্য, লাল সবুজ পাথরের মানুষ, সোনাহলুদ পিরামিডের খোঁজে, চলো বেড়িয়ে আসি, রক্তমুখী শিলা পাহাড়, কিশোর উপন্যাস সমগ্র, সুখী রাজার গল্প, হিলারী যখন ঢাকায় আমরা তখন কাঠমুন্ডুতে, রোবটের চোখ নীল, ইশা খাঁ, ছোটদের উপহার নামক উপন্যাস ৷

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সম্পাদক ও চিত্র পরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সাথে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তানের মধ্যেে ইম্প্রেস টেলিফিল্ম-চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, রন্ধন বিশেষজ্ঞ কেকা ফেরদৌসী, স্থপতি ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী। লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন দীর্ঘদিন যাবৎ শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে জড়িত থেকেছেন। বাংলা একাডেমি কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের গঠনতন্ত্রের পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জুরিবোর্ডের বিচারক হিসেবে তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিস ক্লাব, বিজনেস ও প্রফেশনাল উইমেনস ক্লাব, বাংলাদেশ লেখক শিবির, বাংলাদেশ কথাশিল্পী সংসদ ও মহিলিা সমিতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাবেয়া খাতুন ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে একুশে পদক, ১৯৯৮ সালে ঋষিজ সাহিত্য পদক ও অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার এবং ১৯৯৯ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি নাটকের জন্য ১৯৯৭ সালে টেনাশিনাস পুরস্কার এবং চলচ্চিত্রের জন্য ২০০৫ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমানে অসুস্থতা কারণে দীর্ঘদিনের লেখার অভ্যাস আর কলমের প্রতি ভালবাসায় ছেদ পড়েছে। দুঃখ করে বলেন, ”লিখতে বসলে আর কোনদিকে আমার মন থাকতো না“। কিন্তু সেই মানুষটির এখন আর লিখতে ভালো লাগছে না।

উপসংহারঃ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় রাবেয়া খাতুনের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। তার সাহিত্য সৃষ্টিতে বহুমাত্রিকতা, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের মনের অন্তঃচেতনার জাগরণ, নির্লিপ্ততা, শিল্পের জন্য শিল্প, মানুষের জন্য শিল্প, সাহিত্যের বস্তুতান্ত্রিকতা, নারী জাগরণ, সমাজের ব্রত্য অন্তজ আবমান বাংলা জীবনের ছবির সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের নৈসর্গ চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার সৃষ্টিকর্মে। সাহিত্যকর্ম বিবেচনায় তিনি একদিকে গ্রামভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজের রূপান্তরের রূপকার এবং অন্যদিকে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিকাশ ও বিবর্তনের দ্রষ্টা। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক প্রতিভার সমন্বয়। মহৎপ্রাণ কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের আজ ৮২তম জন্মবার্ষিকী। কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের জন্মদিনে লিখালিখি ব্লগের পক্ষ থেকে অফুরন্ত শুভেচ্ছা।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন