Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি আহসান হাবীব এবং প্রতিথযশা কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা

খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি আহসান হাবীব এবং প্রতিথযশা কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা


শওকত ওসমান, বাংলা কথাসাহিত্যে বহুমাত্রিক সাফল্যের অধিকারী এক ব্যাক্তিত্ব। তিনি ছিলেন অসম্প্রদায়িক এবং আবেগপ্রবন, স্নেহশীল ও বন্ধুবৎসল। সমাজ সচেতন এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে আস্থাশীল। ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি আজীবন শোষিত বঞ্চিত আর নিগৃহিতদের কাতারে দাঁড়িয়ে মানব কল্যানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখে ছিলেন। তিনি তার জীবদ্দশায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সব কিছুর উর্দ্ধে মানুষ। মানুষ কে মানুষ হয়ে ওঠা জরুরী। যে মানুষ কেবল মানবকল্যানের কাজে নিবেদিত থাকবে। ১৯১৭ সালের আজকের দিনে জন্ম গ্রহণ করেন সমাজ সচেতন দিকপাল লেখক শওকত ওসমান। কাকতালীয় ভাবে ১৯১৭ সালের আজকের দিনে পিরোজপুরে জন্মগ্রহণ করেন কবি আহসান হাবিব। কবি আহসান হাবীব এবং শওকত ওসমান ছিলেন ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তরুণ বয়সে কলকাতা থেকে শুরু করে জীবন সায়াহ্নেও সেই বন্ধুত্ব ছিল অটুট। খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি আহসান হাবীব এবং কথাশিল্পী শওকত ওসমানের শততম জন্মবার্ষিকী আজ। বাংলাদেশের প্রতিথযশা এই দুই কবির জন্ম শতবার্ষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা।

স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ব সব্যসাচি লেখক শওকত ওসমান একজন সার্থক কথাশিল্পী। গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক, কবিতা, আত্মজীবনী, স্মৃতিখণ্ড, শিশুতোষ ইত্যাদি বিষয়ে লিখেছেন অনেক। নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রস-রচনা, রাজনৈতিক লেখা, শিশু-কিশোর সাহিত্য সর্বত্র তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তারুণ্যের দিপ্তিতে সদা উজ্জ্বল শওকত ওসমান ১৯১৬ সালে ২রা জানুয়ারী পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জেলার জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। পিতা শেখ মোহাম্মদ এহিয়া, মাতা গুলজান বেগম। পড়াশোনা করেছেন মক্তব, মাদ্রাসা, কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ালেখা শুরু করলেও পরবর্তীতে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ ও অর্থনীতি বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। আইএ পাস করার পর তিনি কিছুদিন কলকাতা করপোরেশন এবং বাংলা সরকারের তথ্য বিভাগে চাকরি করেন। এমএ পাস করার পর ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে লেকচারার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ অফ কমার্সে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সাল থেকে ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করে ১৯৭২ সালে স্বেচ্ছা অবসরে যান। চাকরি জীবনের প্রথমদিকে কিছুকাল তিনি ‘কৃষক’ পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি চলে আসেন পূর্ববঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তিনি ছিলেন এক উচ্চকিত কণ্ঠের অধিকারী। তবে কথাশিল্পের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান কতটা সুদৃঢ় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শওকত ওসমানের ভাষা ও রচনারীতির যে বিন্যাস, শব্দ চয়নের যে অভিনবত্ব তাতে নিঃসন্দেহে তাঁর শিল্পী সত্তার পরিচয় মেলে। শওকত ওসমানের গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
উপন্যাসঃ জননী (১৯৫৮) (১ম উপন্যাস), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৯৬৭), চৌরসন্ধি (১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩), আর্তনাদ (১৯৮৫), রাজপুরুষ (১৯৯২)
গল্পগ্রন্থঃ জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫২), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৯০).
প্রবন্ধগ্রন্থঃ ভাব ভাষা ভাবনা (১৯৭৪), সংস্কৃতির চড়াই উৎরাই (১৯৮৫), মুসলিম মানুষের রূপান্তর (১৯৮৬),
নাটকঃ আমলার মামলা (১৯৪৯), পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা (১৯৯০),
শিশুতোষ গ্রন্থঃ ওটেন সাহেবের বাংলো (১৯৪৪), মস্কুইটোফোন (১৯৫৭), ক্ষুদে সোশালিস্ট (১৯৭৩). পঞ্চসঙ্গী (১৯৮৭).
রম্যরচনাঃ নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত (১৯৮২),
স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থঃ স্বজন সংগ্রাম (১৯৮৬), কালরাত্রি খ-চিত্র (১৯৮৬), অনেক কথন (১৯৯১),
গুড বাই জাস্টিস মাসুদ (১৯৯৩), মুজিবনগর (১৯৯৩), অস্তিত্বের সঙ্গে সংলাপ (১৯৯৪), সোদরের খোঁজে স্বদেশের সন্ধানে (১৯৯৫),মৌলবাদের আগুন নিয়ে খেলা (১৯৯৬), আর এক ধারাভাষ্য (১৯৯৬).
অনূদিত গ্রন্থঃ নিশো (১৯৪৮-৪৯), লুকনিতশি (১৯৪৮).বাগদাদের কবি (১৯৫৩), টাইম মেশিন (১৯৫৯), পাঁচটি কাহিনী (লিও টলস্টয়, ১৯৫৯), স্পেনের ছোটগল্প (১৯৬৫), পাঁচটি নাটক (মলিয়ার, ১৯৭২), ডাক্তার আবদুল্লাহর কারখানা (১৯৭৩) , পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মানুষ (১৯৮৫), সন্তানের স্বীকারোক্তি (১৯৮৫)
অন্যান্য গ্রন্থসমূহঃ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র, উপন্যাসসমগ্র -১, উপন্যাসসমগ্র-২, উপন্যাসসমগ্র-৩, গল্পসমগ্র, কিশোরসমগ্র-১,কিশোরসমগ্র- ২
শওকত ওসমান তাঁর লেখার স্বীকৃতি সরূপ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন যথাঃ
১। বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), ২। আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), ৩। প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), ৪। একুশে পদক (১৯৮৩), ৫। মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), ৬। স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) ও ৭। আলাওল সাহিত্য পুরস্কার
বাংলাদেশের প্রতিথযশা সব্যসাচী এই লেখক ১৯৯৮ সালের ১৪ মে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। জীবন মৃত্যুর মাঝের দীর্ঘ সময় বিচরণ করেন সাহিত্যের আঙ্গিনায়। আজ তাঁর ১০০তম জন্মবার্ষিকী। কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমানের জন্ম দিনে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।

খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি আহসান হাবীব। ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে ৷ তাঁর পিতার নাম হামিজুদ্দীন হাওলাদার৷ মাতা জমিলা খাতুন৷ তাঁর পাঁচ ভাই চার বোন৷ অর্থনৈতিক ভাবে অসচ্ছল পিতা মাতার প্রথম সন্তান তিনি৷ পারিবারিক ভাবে আহসান হাবীব সাহিত্য সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন৷ সেই সূত্রে বাল্যকাল থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি৷ সেইসময় তাঁর বাড়িতে ছিল আধুনিক সাহিত্যের বইপত্র ও কিছু পুঁথি৷ যেমন আনোয়ারা, মনোয়ারা, মিলন মন্দির প্রভৃতি৷ এসব পড়তে পড়তে একসময় নিজেই কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করেন। ১২/১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার সময়ই ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর একটি প্রবন্ধ ধরম’ প্রকাশিত হয়৷১৯৩৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা মায়ের কবর পাড়ে কিশোর পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়৷ পরবর্তী সময়ে ছাত্রাবস্থায় কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হলে নিজের সম্পর্কে আস্থা বেড়ে যায়৷ স্কুলে পড়াকালীন তিনি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে কবিতায় উপস্থাপিত করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন৷ ততদিনে অবশ্য দেশ, মোহাম্মদী, বিচিত্রার মতো নামি দামি পত্রপত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়ে গেছে৷
সাহিত্যের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷এরপর তিনি চলে আসেন বরিশালে৷ ভর্তি হন সেখানকার বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজে৷ কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কলেজের পড়াশোনার পাঠ শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত রাখতে হয় তাঁকে৷ বিএম কলেজে দেড় বছর পড়ার পর ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে তিনি রাজধানী কলকাতায় পাড়ি জমান৷ এভাবেই কবি আহসান হাবীবের বরিশাল থেকে তত্‍কালীন রাজধানী কলকাতায় পদার্পণ করেন।

কলকাতা গিয়ে শুরু হয় আহসান হাবীবের সংগ্রামমুখর জীবনের পথচলা ৷ তিনি কলকাতায় এসে ১৯৩৭ সালে দৈনিক তকবির পত্রিকার সহ সম্পাদকের কাজে নিযুক্ত হন । বেতন মাত্র ১৭ টাকা৷ পরবর্তীতে তিনি ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার বুলবুল পত্রিকা ও ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত মাসিক সওগাত পত্রিকায় কাজ করেন৷ এছাড়া তিনি আকাশবাণীতে কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট পদে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন৷ আহসান হাবীব ১৯৪৭ সালের ২১ জুন বিয়ে করেন বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া নিবাসী মহসীন আলী মিয়ারকন্যা সুফিয়া খাতুনকে। দুই কন্যা ও দুই পুত্রের জনক ছিলেন আহসান হাবীব। তার দুই কন্যা হচ্ছেন, কেয়া চৌধুরী ও জোহরা নাসরীন এবং তাঁর দুই পুত্র হচ্ছেন, মঈনুল আহসান সাবের ও মনজুরুল আহসান জাবের। পুত্র মঈনুল আহসান সাবের একজন স্বনামখ্যাত বাংলা ঔপন্যাসিক। আহসান হাবীবের কাব্যগ্রন্থ, বড়দের উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটদের ছড়া ও কবিতার বই সব মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা ২৫টির মতো।
কবিতাঃ রাত্রিশেষ (১৯৪৮), ছায়াহরিণ (১৯৬২), সারা দুপুর (১৯৬৪), আশায় বসতি (১৯৭৪), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬), দু’হাতে দুই আদিম পাথর (১৯৮০), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), বিদীর্ণ দর্পনে মুখ (১৯৮৫)
উপন্যাসঃ রাণী খালের সাঁকো, আরণ্য নীলিমা,
শিশু সাহিত্যঃ জোছনা রাতের গল্প, ছুটির দিন দুপুরে,বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, ছুটির দিন দুপুরে, রেলগাড়ি ঝমামমে, রাণীখালের সাঁকো, জোৎসনা রাতের গল্প, ছোট মামা দি গ্রেট, পাখিরা ফিরে আসে, রত্নদ্বীপ( ট্রেজার আইল্যান্ডর সংৰিপ্ত অনুবাদ ), হাজীবাবা, প্রবাল দ্বীপে অভিযান (কোরাল আইল্যান্ডর সংৰিপ্ত অনুবাদ),
সম্পাদিত গ্রন্থঃ কাব্যলোক,বিদেশের সেরা গল্প
তার লেখার স্বীকৃতিসরূপ তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত হন যথাঃ
১। ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার ও একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), ২। আদমজী পুরস্কার (১৯৬৪), ৩। নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), ৪। একুশে পদক (১৯৭৮), ৫। আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮০), ৬। স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ৭। বাংলা একাডেমী পুরস্কার ইত্যাদি। খ্যাতিমান বাংলাদেশী এই কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদকি ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি আহসান হাবীব এবং কথাশিল্পী শওকত ওসমানের শততম জন্মবার্ষিকী আজ। বাংলাদেশের প্রতিথযশা এই দুই কবির জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন