Breaking News
Home / খেলাধুলা / আড়াই দিনেই শেষ পাঁচ দিনের টেস্ট!

আড়াই দিনেই শেষ পাঁচ দিনের টেস্ট!

শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংসে করল ২২২, বাংলাদেশ অলআউট ১১০ রানেই। স্বাগতিকদের থেকে ১১২ রানে এগিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কার ঝুলিতে দ্বিতীয় ইনিংসে জমল আরো ২২৬, এবারও বাংলাদেশ গুটিয়ে গেল ১২৩ রানে! সময়কাল পাঁচ দিনের হলেও ঢাকা টেস্টের ঘটনাক্রম শেষ হল মাত্র আড়াই দিনেই! তৃতীয় দিন শ্রীলঙ্কা সেরেছে কেবল আনুষ্ঠানিকতা। ব্যাটে-বলে, মেজাজে, মানসিকতায়ও বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে চন্ডিকা হাতুরুসিংহের শিষ্যরা। মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশকে ২১৫ রানে হারিয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ জিতে নিয়েছে ১-০ ব্যবধানে। এই টেস্ট ড্র করতে পারলেও প্রথমবারের মতো ধরা দিত র‌্যাঙ্কিংয়ের আট নম্বর জায়গা। ম্যাচ হেরে উল্টো বাংলাদেশের হারাতে হচ্ছে রেটিং পয়েন্ট। পাশাপাশি পেতে হলো ২০১৫ সালের পাকিস্তান সিরিজের পর দেশের মাটিতে প্রথম হারের তেতো স্বাদ।
গতকাল শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে তৃতীয় দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে খেলতে পেরেছে মাত্র ২৯.৩ ওভার। যেন প্রথম ইনিংসের অ্যাকশন রিপ্লে হয়েছে দ্বিতীয় ইনিংসেও। ১০০ থেকে ১২৩। ২৭ বলের মধ্যে এই ২৩ রানেই পড়েছে শেষ ৬ উইকেট। শের-ই-বাংলায় এত কম ওভারে অলআউট হয়নি আগে কোনো দলই। বাংলাদেশকে বলতে গেলে একা হাতেই গুড়িয়ে দিয়েছেন এক নতুন মুখ- আকিলা ধনঞ্জয়া। দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিকদের মূল হন্তারক লঙ্কান এই অফ স্পিনারই। অভিষিক্ত অফ স্পিনার ৫ ওভারের স্পেলেই ২৪ রানে পেয়েছেন ৫ উইকেট। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে যা সেরা। তিনি বল করতে আসার পর বাংলাদেশের ইনিংসে চলেছে আসা-যাওয়ার মিছিল। দুই ইনিংস মিলিয়ে এই স্পিনার পেলেন ৮ উইকেট। ৪৯ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন অভিজ্ঞ রঙ্গনা হেরাথও। ওয়াসিম আকরামকে (৪১৩) ছাড়িয়ে তিনিই (৪১৫) এখন টেস্ট সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি বোলার।
ম্যাচ আসলে প্রথম ইনিংসেই শেষ করে ফেলেছিল বাংলাদেশ। বাকিটুকু যা হয়েছে সেটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়। ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা বটে, তবে কিছু কিছু ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে দেওয়া যায়। দ্বিতীয় দিনেই আসলে সে নিশ্চয়তা পেয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে আসা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছিলেন, তিনশোর বেশি তাড়া করে জেতার খুব আত্মবিশ্বাস আছে তাদের। তার কথায় ক্রিকেট নিয়ে সামান্য জ্ঞান রাখা লোকও মুচকি হেসেছে, রোশেন সিলভা তো এমন ভাবনাকে কাÐজ্ঞানের বাইরেই বলে দিয়েছিলেন। দেবেন নাই বা কেন? চতুর্থ ইনিংসে তিনশোর বেশি তাড়া করে জেতার রেকর্ডই হাতেগোনা। বাংলাদেশের সেরকম কোন ইতিহাস নেই। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটা ২০৯ রানের। প্রথম ইনিংসে ১১০ রানে গুটিয়ে যাওয়া এই বাংলাদেশ অমন ইতিহাস গড়ে ফেলবে, কেবল খাতায় কলমেই তা সম্ভব।
স্পিনাররা টার্ন বাউন্স পাচ্ছিলেন প্রথম দিন থেকেই। তৃতীয় দিনে এসে পিচের ক্ষত আরও বড় হয়েছে। খেলার অ্যাপ্রোচ নিয়ে দ্বিধায় থাকা বাংলাদেশ মারবে না ধরবে ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। তবে সবার ধারনার চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা হয়েছে। ‘খুব আত্মবিশ্বাস’ নিয়ে নেমেও ব্যাটিং হয়েছে যাচ্ছেতাই। খারাপ পরিস্থিতি সামলানোর কোন চেষ্টাই দেখা যায়নি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে। ওয়ানডে মেজাজে খেলেছেন সবাই, উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন একের পর এক। ওভারের হিসাবে দ্বিতীয় ইনিংসে আসলে এক সেশনও টিকতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ আগের দিনের ৮ উইকেটে ২০০ রান নিয়ে নামার পর আরও ২৬ রান যোগ করে তবেই ছেড়েছিল শ্রীলঙ্কা। রোশেন সিলভা তো ৭০ রানেই থেকেছেন অপরাজিত। ৩৩৮ রানের লিড। বাংলাদেশের জিততে ৩৩৯। পিচ, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এভারেস্টের চূড়ার চেয়েও বেশি।
বিশাল লক্ষ্য তাড়ায় যিনি এনে দিতে পারতেন কাঙ্খিত শুরু সেই তামিম ইকবাল এই ইনিংসেও ব্যর্থ। দিলরুয়ান পেরেরাকে ফ্রন্টফুটে খেলতে এসে ভড়কে গেলেন। বল পায়ে লাগল, আবেদনে সাড়া দিলেন আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও রক্ষা নেই তামিমের। দলের তখন রান ৩, তামিমের ২। ইমরুল কায়েস শুরু থেকেই হাঁসফাঁস করেছেন। বারবার বেরিয়ে এসে চাপ সরাতে চেয়েছেন। পারেননি বেশিদূর আগাতে। ১৭ রানে পেরেরার বলে পুশ করতে গিয়ে ব্যাটের কানায় লাগিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনে।
ওয়ানডাউনে নেমে মুমিনুল হক খেলছিলেন স্বচ্ছন্দে। ইতিবাচক মানসিকতা ছিল ব্যাট করার ধরনে। জীবন পেয়েছিলেন, তা কাজে লাগানোর আভাস মিলছিল। লাঞ্চের পর আর টিকেননি। লঙ্কানদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কাÐারি রঙ্গনা হেরাথ উইকেটের পেছনে বানিয়েছেন তাকে। মুশফিকুর রহিমের ঘাতকও হেরাথ। চুম্বকের মতো তাকে ক্রিজ থেকে টেনে এনে স্টাম্পিং বানিয়েছেন। ক্রিজে গিয়েই অবশ্য মুশফিক ছিলেন অস্থির। অকারনে রিভার্স সুইপের চেষ্টা চালিয়েছেন, স্বস্তি ছিল ব্যাট করার ধরণে।
মুশফিকের আউটের আগেই আক্রমণে এসে উইকেট নেওয়ার উৎসব করেন অফ স্পিনার আকিলা। শেষ ৬ উইকেটের ৫টাই নিয়েছেন তিনি। লিটন দাসকে দিয়ে শুরু আকিলার উইকেট উৎসব। টার্ন আর বাউন্সে ভড়কে যাওয়া লিটন ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে। মাহমুদউল্লাহরও একই দশা। তার ক্যাচ অবশ্য গেছে ¯িøপে। দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র খেলেছেন মাত্র ৫ বল, করেছেন ১ রান। নিজের জায়গা আবার প্রশ্নবিদ্ধ করে আউট হয়েছেন দৃষ্টিকটুভাবে। মেহেদী হাসান মিরাজ এক ছক্কা মেরে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনে। আব্দুর রাজ্জাক, তাইজুল ইসলাম ম্যাচের আয়ু বাড়তে দেননি। টপাটপ ফিরে চা-বিরতির অনেক আগেই ম্যাচের এপিটাফ লিখে ফেলতে সহায়তা করেছেন কেবল।
সিরিজের সেরা ৫
ব্যাটসম্যান
ইনিংস রান সর্বোচ্চ গড় স্ট্রাইক ১০০/৫০
মুমিনুল (বাংলাদেশ) ৪ ৩১৪ ১৭৬ ৭৮.৫০ ৭১.৬৮ ২/০
মেন্ডিস (শ্রীলঙ্কা) ৩ ২৭১ ১৯৬ ৯০.৩৩ ৬০.৭৬ ১/১
সিলভা (শ্রীলঙ্কা) ৩ ২৩৫ ১০৯ ১১৭.৫০ ৪৭.০৯ ১/২
মাহমুদউল্লাহ (বাংলাদেশ) ৪ ১৩৪ ৮৩* ৬৭.০০ ৫২.৯৬ ০/১
লিটন (বাংলাদেশ) ৪ ১৩১ ৯৪ ৩২.৭৫ ৫০.৯৭ ০/১
বোলার

ইনিংস উইকেট ম্যাচসেরা গড় ইকো. ৫/১০
তাইজুল (বাংলাদেশ) ৩ ১২ ৮/১৫৯ ৩১.৫০ ৩.৩৫ ০/০
হেরাথ (শ্রীলঙ্কা) ৪ ৯ ৫/২৩০ ৩৪.৪৪ ৩.৫০ ০/০
ধনঞ্জয়া (শ্রীলঙ্কা) ২ ৮ ৮/৪৪ ৫.৫০ ২.৯৩ ১/০
লাকমাল (শ্রীলঙ্কা) ৪ ৬ ৩/৩৬ ২১.৫০ ২.৬৯ ০/০
মুস্তাফিজ (বাংলাদেশ) ৩ ৬ ৫/৬৬ ২৯.৮৩ ২.৯৮ ০/০
স্কোর কার্ড
বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা, ২য় টেস্ট ৩য় দিন
টস : শ্রীলঙ্কা, মিরপুর
(২য় দিন শেষে) শ্রীলঙ্কা ১ম ইনিংস ৬৫.৩ ওভারে ২২২। বাংলাদেশ ১ম ইনিংস ৪৫.৪ ওভারে ১১০
শ্রীলঙ্কা ২য় ইনিংস ৬২ ওভার ২০০/৮ (করুণারতেœ ৩২, ধনঞ্জয়া ২৮, গুণাথিলাকা ১৭, চান্দিমাল ৩০, সিলভা ৫৮ ব্যাটিং, লাকমাল ৭ ব্যাটিং; রাজ্জাক ১/৬০, মুস্তাফিজ ৩৫/৩, তাইজুল ৭২/২, মিরাজ ২৯/২)।
রান বল ৪ ৬
সিলভা অপরাজিত ৭০ ১৪৫ ১০ ০
লাকমাল বোল্ড তাইজুল ২১ ৪১ ৪ ০
হেরাথ এলবি ব তাইজুল ০ ১ ০ ০
অতিরিক্ত (লেবা ৪) ৪
মোট (৭৩.৫ ওভার, অলআউট) ২২৬
উইকেট পতন : ১-১৯ (মেন্ডিস), ২-৫৩ (সিলভা), ৩-৮০ (গুনাথিলাকা), ৪-৯২ (করুণারতেœ), ৫-১৪৩ (চান্দিমাল), ৬-১৭০ (ডিকভেলা), ৭-১৭৮ (পেরেরা), ৮-১৭৮ (ধনঞ্জয়া), ৯-২২৬ (লাকমাল), ১০-২২৬ (হেরাথ)।
বোলিং : রাজ্জাক ১৭-২-৬০-১, মুস্তাফিজ ১৭-৩-৪৯-৩, তাইজুল ১৯.৫-২-৭৬-৪, মিরাজ ২০-৫-৩৭-২।
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস রান বল ৪ ৬
তামিম এলবি ব পেরেরা ২ ৭ ০ ০
ইমরুল ক ডিকভেলা ব হেরাথ ১৭ ২২ ১ ১
মুমিনুল ক ডিকভেলা ব হেরাথ ৩৩ ৪৭ ৩ ০
মুশফিক স্ট্যাম্প ব হেরাথ ২৫ ৫১ ৪ ০
লিটন ক মেন্ডিস ব ধনঞ্জয়া ১২ ২০ ০ ০
মাহমুদউল্লাহ ক করুণারতেœ ব ধনঞ্জয়া ৬ ৮ ১ ০
সাব্বির ক মেন্ডিস ব ধনঞ্জয়া ১ ২ ০ ০
মিরাজ ক ডিকভেলা ব ধনঞ্জয়া ৭ ৬ ০ ১
রাজ্জাক স্ট্যাম্প ব ধনঞ্জয়া ২ ৩ ০ ০
তাইজুল ক গুণাথিলাকা ব হেরাথ ৬ ৮ ১ ০
মুস্তাফিজ অপরাজিত ৫ ৩ ১ ০
অতিরিক্ত (বা ৬, লেবা ১) ৭
মোট (২৯.৩ ওভার, অলআউট) ১২৩
উইকেট পতন : ১-৩ (তামিম), ২-৪৯ (ইমরুল), ৩-৬৪ (মুমিনুল), ৪-৭৮ (লিটন), ৫-১০০ (মাহমুদউল্লাহ), ৬-১০২ (মুশফিক), ৭-১০২ (সাব্বির), ৮-১০৪ (রাজ্জাক), ৯-১১৩ (মিরাজ), ১০-১২৩ (তাইজুল)।
বোলিং : লাকমাল ৩-০-১১-০, পেরেরা ১০-০-৩২-১, হেরাথ ১১.৩-১-৪৯-৪, ধনঞ্জয়া ৫-১-২৪-৫।
ফল : বাংলাদেশ ২৫১ রানে পরাজিত।
ম্যাচ সেরা : রোশেন সিলভা (শ্রীলঙ্কা)।
সিরিজ : ২ ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ১-০ তে জয়ী।
সিরিজ সেরা : রোশেন সিলভা (শ্রীলঙ্কা)।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন