Breaking News
Home / বাংলাদেশ / হঠাৎ রওশন এরশাদের এই আকুতি কেন?

হঠাৎ রওশন এরশাদের এই আকুতি কেন?


২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, নব্বইয়ের পর কোনো সরকারই আমার সঙ্গে সুবিচার করেনি। আমি একজন শৃঙ্খলবদ্ধ রাজনীতিবিদ। আমার হাত পা বাঁধা। বিএনপির আমলে দায়ের করা মামলা এক মাস আগেও সচল করেছে সরকার। সবাই আমাকে শৃঙ্খলের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে চায়। কিন্তু এবার আমাকে শৃঙ্খলের দড়ি দিয়ে আটকে রাখতে পারবে না। সকল শৃঙ্খলের দড়ি ছিড়ে ফেলবো।

কিন্তু এরশাদের এ ঘোষণার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো দলটির মূল ক্ষমতা এখন আর এরশাদের কাছে নেই, রওশন এরশাদের কাছেও নেই। দলের প্রাণভোমরা হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা।

জাতীয় পার্টির ‘সম্মান’ বাঁচাতে মন্ত্রিসভা থেকে দলটির নেতাদের বাদ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চাইলেন রওশন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো সংসদে বিরোধী দলের আসন নেয়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভায়ও যোগ দিয়ে চার বছর পার করার পর এখন দলের ‘সম্মানহানির’ উপলব্ধির কথা জানালেন রওশন। উল্লেখ্য, জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর তিন সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মন্ত্রী এবং মুজিবুল হক চুন্নু ও মশিউর রহমান রাঙ্গা বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী। আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকেও করা হয় মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের থাকা না থাকাটি দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও রওশনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গেল, সেই ভারও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপরই দিয়ে বসে আছেন তিনি। রওশন বড়ই আক্ষেপ করে বললেন, ‘সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে লজ্জা লাগে। আমরা সরকারি, না বিরোধী দল? বিদেশে গেলে বলতে পারি না আমরা কী?’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর সংসদে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের মধ্যে লড়াই অনেক আগেই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যারা এক সময় রওশনের পক্ষ নিয়ে এরশাদকে কুপোকাত করেছিলেন, তারা আবার এরশাদের দলে যোগ দিয়েছেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক দিয়ে রওশনের পাল্লা এখনও ভারী। তারা বলেন, আসলে জাতীয় পার্টির মূল রশি এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি রশি টান দিলে এরশাদ চেষ্টা করেও দলকে আর তার অনুগত করতে পারবেন না। কারণ রওশন আর জাপার দুই মন্ত্রী কখনো মন্ত্রিত্ব ছাড়বেন না। প্রকৃতপক্ষে তারা তো প্রধানমন্ত্রীর অধীন।

বিশ্লেষকরা বলেন, তথাকথিত বিরোধী দলের ঘরের ভেতরের বিরোধ মীমাংসার জন্য শুধু রওশন নন, দলটির অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন। এর আগে এরশাদ এবং রাঙ্গাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে দলের ঘরোয়া দ্বন্দ্ব নিয়ে নালিশ করেছেন। এতে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রী শুধু ক্ষমতাসীন দলের সভানেত্রী নন, সংসদের বিরোধী দলের নীতিনির্ধারকও বটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ’৮৬ ও ’৮৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে গৃহপালিত বিরোধী দল তৈরি করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল নিয়েছিলেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস এরশাদের দল এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দল। আর সেই বিরোধী দলের নেতা এরশাদ না তার বিবি রওশন হবেন, তা নিয়েই লড়াই জলছে। এই লড়াইয়ে এরশাদ বারবার হেরে যাচ্ছেন। কারণ দলের মূল প্রাণভোমরা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। আর তিনি রয়েছেন রওশনের পক্ষে। ফলে এরশাদ যত কথাই বলুক, জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ এখন কোনোভাবেই তিনি আর পাবেন না।

জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা বহু ভাগে বিভক্ত জাতীয় পার্টির বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো ভবিষ্যৎ আছে বলে কেউ মনে করেন না। দলটির নেতারাও তা ভালো করেই জানেন। ফলে ব্যক্তিগতভাবে কে কতটা সুযোগ-সুবিধা নিতে পারেন এখন সেই প্রতিযোগিতা চলছে। অপর দিকে ক্ষমতাসীনেরা এটা ভালো করেই জানেন, শুধু জাতীয় পার্টি নয়, যত বেশি দলকে সাথে রাখতে পারবেন তত লাভ। কারণ এই সরকার যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাতে জনগণের কোনো সমর্থন নেই। জনসমর্থনহীন সরকারের রাজনৈতিক সহযোগী যত বাড়বে দায়দায়িত্বের চাপ কিছুটা হলেও কমবে। এ কারণে এ ধরনের সরকারে ছোট দলের নেতারা বড় মন্ত্রী হয়ে যান। তাদের সব সময় সরব রাখা হয়। জনগণের দৃষ্টি এদের দিকে থাকে। এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়েও সরকার একই কৌশল নিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক গুরুত্ব এখন নেই বললেই চলে। বহু আগেই জাতীয় পার্টি বৃহত্তর রংপুরকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে। গত উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রংপুর অঞ্চলেও জাতীয় পার্টির ভিত ধসে পড়েছে। বৃহত্তর রংপুরে মাত্র দুটি উপজেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে একজন আবার কাজী জাফর আহমদের সমর্থক। রংপুর অঞ্চলে বেশির ভাগ উপজেলায় জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। কিছু কিছু স্থানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীও বিজয়ী হয়েছেন। ফলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক শক্তি বেড়েছে। এর বড় কারণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে আন্দোলনের সুফল দল দুটি পেয়েছে।

এদিকে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীতের মধ্যেও তত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নিজের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই চিন্তিত। আগামীতে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসতে পারে তাহলে এরশাদের আবার জেলে যেতে হয় কিনা এনিয়ে তিনি টেনশনে আছেন। জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে এমনই আভাস পাওয়া গেছে।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় একজন নেতা যিনি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিপক্ষে ছিলেন, তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতার শেষ প্রান্তে এসে আমাদের চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেব এখন শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি টেনশনে আছেন। কারণ এরশাদের জন্যই আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করতে পেরেছে। তাই বিএনপি-জামায়াতের ক্ষোভটা আওয়ামী লীগের চেয়েও তার ওপর বেশি। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে বিএনপি-জামায়াত সেই প্রতিশোধ নিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘২ কোটি টাকা দুর্নীতির জন্য সরকার খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা যতটুকু জানতে পারছি, বিএনপিকে বাদ দিয়ে ৫ জানুয়ারির মতো আর কোনো নির্বাচন আওয়ামী লীগ করতে চাচ্ছে না। বিএনপিকে সমঝোতায় আনার জন্যই মূলত খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়েছে। খালেদা জিয়া যদি সমঝোতায় চলে আসে তাহলে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জোটবদ্ধ নির্বাচন করবে। কিন্তু, খালেদা জিয়া যদি সমঝোতায় না আসেন তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। আমাদের স্যারের ভয়টা এখানেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এরশাদের একজন উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের চেয়ারম্যানের মামলাগুলো ঝুলিয়ে রেখেছে। যাতে তিনি অন্য কোনো দিকে মুভ করতে না পারেন। এখন এ অবস্থায় যদি বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসে তাহলে মামলাগুলোর কার্যক্রম আবার পুরোদমে চালু করবে। এমনকি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রতিশোধ নিতে বিএনপি আমাদের চেয়ারম্যানকে আবারো জেলে নিতে পারে।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন