Breaking News
Home / বিজ্ঞান-প্রযুক্তি / তথ্য-প্রযুক্তি / ক্লোনিং গবেষণায় এ বার চিনা বিপ্লবঃ পর্ব-২ (শেষ)

ক্লোনিং গবেষণায় এ বার চিনা বিপ্লবঃ পর্ব-২ (শেষ)


এই পরীক্ষার ভবিষ্যত কী?
এই আবিষ্কারের একটি যুগান্তকারী সম্ভাবনা হল বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সের উন্নতি। বাঁদর যেহেতু মানুষের পূর্বসূরী, তাই তাদের উপর কোনও ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়াল যদি সফল হয়, তা হলে সেটা মানবদেহে কী ভাবে কাজ করতে পারে, তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স বিভাগের প্রধান মৈনাক সেনগুপ্ত বলছেন, ‘’একই জিনগত বৈশিষ্ট্যের যদি অসংখ্য এই রকম ক্লোন তৈরি করা যায়, তাহলে তাদের উপরেই নানা ওষুধের মান পরীক্ষা করা যাবে। মানুষের উপর প্রয়োগের আগে বাঁদরদের উপর পরীক্ষা করেই বোঝা যাবে কোন ওষুধের কার্যকারিতা কী, প্রয়োগের ফলে তা দেহে কী কী পরিবর্তন আনছে এবং ভবিষ্যতে কোন দুরারোগ্য ব্যধির চিকিত্সার কাজে প্রয়োগ করা যেতে পারে।’’
একই মত বিজ্ঞানী ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরভ ঘোষ ও স্বাগতা ঘোষেও। তাঁরা জানিয়েছেন ম্যাকাকাদের দেহগত বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে নানা রকম ‘রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ চিকিত্সা পদ্ধতির প্রয়োগ এ বার সহজেই করা যাবে।
এনসিবিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিস্ট স্বাগতা ঘোষ বলছেন, ‘‘ম্যাকাকা বাঁদর এবং মানুষের মধ্যে জিনগত সাদৃশ্য রয়েছে। তাই এই পদ্ধতিতে অনেক বেশি ক্লোন (ক্লোন মডেল) তৈরি করে তাদের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করা অনেক সহজ হবে।’’
জিনতত্ত্ববিদ ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘জিন ম্যানিপুলেশনের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে এই আবিষ্কারের মাধ্যমে। জিনগত অস্বাভাবিকতা (জেনেটিক মিউটেশন) এবং তার ফলে তৈরি হওয়া নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধি কেন হয় এবং তার প্রতিকার কী কী, সেই বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে। ফলে, অ্যালজাইমার’স,ডায়াবিটিসের মতো রোগ নিরাময় অনেক সহজ হয়ে যাবে।’’
এই গবেষণার ফলে সুবিধা হতে পারে ‘জিন এডিটিং’-এও। মানবদেহে ‘জিন এডিটিং’ বা ত্রুটিপূর্ণ জিনের সংশোধন পদ্ধতি নিয়ে অনেক নতুন তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে আসবে। ‘জিন এডিটিং’ পদ্ধতিতে প্রাণীর দেহ থেকে ত্রুটিপূর্ণ বা রোগ তৈরি করতে পারে এমন জিন সরিয়ে ফেলা এ বার সম্ভব হতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ক্রিসপার’। বংশপরম্পরার চলে আসা কোনও রোগ এই প্রক্রিয়ায় নিরাময় করা সম্ভব।
গবেষণার সুফল নিয়ে বিজ্ঞানীরা যা বলেছেন তার নির্যাস:

ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এখন মানুষের দেহ এই রকম ক্রুটিপূর্ণ জিন নিয়ে বাঁদরের দেহে ইনজেক্ট করে যদি তার ক্লোন তৈরি করা যায় তা হলে বাঁদরটির দেহেও একই রকম রোগ বাসা বাধবে যা মানুষের দেহে হয়। এ বার সেই বাঁদরটিকেই ‘মডেল’ হিসেবে নিয়ে তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে রোগের কারণ এবং তার প্রতিকারের পথ আবিষ্কার করা অনেক সহজ হবে। ড্রাগ রিসার্চের নতুন দিগন্তও খুলে যাবে এই গবেষণায়।
বাঁদরের পর কি এ বার মানুষের পালা?
‘মানব ক্লোনিং’ নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। বিজ্ঞানীদের দাবি বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে মানব ক্লোনিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্রিয়া, এই গবেষণা সফল হলে প্রজননগত বহুরকম ত্রুটি দূর করা সম্ভব হবে। কিন্তু, গবেষকদের এই মতে বাধ সাধে বিভিন্ন দেশের বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নৈতিকতার খাতিরে অনেক বিজ্ঞানীদের মধ্যেও দেখা দেয় সংশয়। মানুষের ক্লোন তৈরি করা উচিত্ না উচিত্ নয় এই নিয়ে তর্ক-বিতর্কের মাঝেই শোনা যায় বাহামাসের একটি সংস্থা ‘ক্লোনেড’ ৩১ বছর বয়সী এক মহিলার ত্বকের কোষ থেকে ‘ইভ’ নামে একটি শিশুকল্যার ক্লোন তৈরি করেছেন। সময়টা ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর। বাস্তবে ক্লোনিং পদ্ধতিতেই ইভের জন্ম হয়েছিল কি না সেই খবরের সত্যতা আজও প্রমাণিত হয়নি। এর পর ২০০৪-০৫ সালে হ্যাং উ-সাক নামে একজন কোরিয়ান বিজ্ঞানী দাবি করেন তিনি সফল ভাবে ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে মানব ভ্রুণ তৈরি করেছেন। তবে এই গবেষণার সত্যতাও প্রমাণিত হয়নি। ২০০৮ সালে ক্যালিফর্নিয়ার ‘স্টিমাজেন’ নামে একটি বায়োটেকনোলজি কোম্পানির গবেষক অ্যান্ড্রু ফ্রেঞ্চ এবং স্যামুয়েল উড পাঁচটি পরিণত মানব ভ্রুণ তৈরি করেন। কিন্তু, পরে নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়ে ভ্রুণগুলি তাঁরা নষ্ট করে দিয়েছিলেন।
মানব ক্লোনিং নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিও তখন দ্বিধাবিভক্ত। একদলের দাবি, এই পক্রিয়া খোদার উপর খোদকারি ছাড়া আর কিছুই নয়। এরই মধ্যে আবার অন্য এক দল ক্লোনিংয়ের সপক্ষেও কথা বলেন।
দ্বিমত দেখা যায় বিজ্ঞানীদের মধ্যেও। একদল দাবি করে মানব ক্লোনিং শুরু হলে বিতর্ক ওরও বাড়বে। বাধা আসবে সমাজের নানা দিক থেকে। আবার ভিন্ন মতও দেখা যায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চের জন্য এতদিন ইঁদুর, গিনিপিগ, খরগোশ জাতীয় প্রাণির উপর নানা অত্যাচার চলত। বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থে একাধারে চলত প্রাণিহত্যা। কিন্তু, ক্লোনিংয়ের গবেষণা সফল হলে এই প্রাণী নিধনে ইতি পড়বে। তবে, মানব ক্লোনিং নিয়ে বিতর্ক আজও চলছে। এই তর্কের শেষ কোথায় সেই নিয়ে এখনও ধন্দে বিজ্ঞানীরা।
সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার পদ্ধতিতেই ‘ঝং ঝং’ ও ‘হুয়া হুয়া’র ‘ক্লোন’ তৈরি করা হয়েছে। কী ভাবে হয় সেই পদ্ধতি?
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে মানব ক্লোনিং নিষিদ্ধ। ইংল্যান্ড, চিন, সুইডেন, সিঙ্গাপুর এবং ইসরায়েলে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও শুধুমাত্র গবেষণার কাজে এই পদ্ধতির প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এখন ‘ঝং ঝং’ এবং ‘হুয়া হুয়া’র গবেষণার সাফল্যের পর এই পদ্ধতি মানব ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়ে ইন্দ্রনীলবাবু বলেছেন, ‘‘এই পরীক্ষা এখনও অনেক দুর্বল। মানুষের উপর তার প্রয়োগ সম্ভব নয়।’’
সৌরভ ও ইন্দ্রনীল এর পিছনে দু’টি কারণ দেখিয়েছেন
প্রথমত, ১২৭টি ডিম্বকোষ থেকে মাত্র দু’টি সুস্থ ম্যাকাকা বাঁদরের জন্ম হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ভ্রুণ কোষ থেকে নিউক্লিয়াসটিকে সরিয়ে নিয়ে ক্লোনিং করেছিলেন। পরিণত এবং প্রাপ্তবয়স্ক দেহকোষ থেকে নিউক্লিয়াস সরিয়ে নিয়ে পরীক্ষা চালানোর পদ্ধতি অনেক জটিল। সে ক্ষেত্রে গর্ভের মধ্যে ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
গভীর অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে চলার যে পথ বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছিলেন ক্লোনিং-এর মাধ্যমে, সেই পথে আশার আরও একটি বাতি জ্বালাল এই গবেষণা।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন