সোমবার , অক্টোবর 21 2019
Breaking News
Home / পাঁচ-মিশালী / সরকার দাবি মানুক, ছাত্ররা ঘরে ফিরুক

সরকার দাবি মানুক, ছাত্ররা ঘরে ফিরুক


আনিসুল হকশিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনব প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অনেকের মনে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা দ্রুতই সংঘাত, শঙ্কার কালিমায় ঢাকা পড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গুজবে স্থির থাকা দায়। মানুষের কষ্ট বাড়ছে, তার চেয়েও দ্রুত হারে বাড়ছে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তাবোধ। কিন্তু সংকট নিরসনে সরকারের ত্বরিত ইতিবাচক পদক্ষেপ কই?

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এটা তো সবারই দাবি। গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের সামনে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পরে শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এসেছে, তারা ৯ দফা দাবি পেশ করেছে। এই দাবিগুলো তো সবাই প্রকাশ্যেই সমর্থন করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ছাত্রছাত্রীদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। প্রথম আলো অনলাইনের খবর:

‘ছাত্রছাত্রীদের সব দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া হয়েছে দাবি করে ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের শুভবুদ্ধির অনেকেই বলেছেন সরকার দাবি মেনে নিচ্ছে।’

এর মধ্যে আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের হাতে ২০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র তুলে দিয়েছেন। ওই কলেজের জন্য পাঁচটা বাস দেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে আরও যেসব দাবি আছে, সেগুলোও অপূরণীয় নয়, কেউ সেসবের বিরোধিতাও করছে না। সব দাবি যে এক দিনে পূরণ করা যাবে না, তা সহজবোধ্য। বিচার রাতারাতি করা যাবে না, কিন্তু একটা তদন্ত কমিটি তো অন্তত করা যেত। বিচার আরম্ভ করার খবরটা তো আমরা পেতে পারতাম। বেপরোয়া গাড়ি চালনা বা অপরাধমূলক চালনার মাধ্যমে প্রাণহানির সাজা কঠোরতর করার উদ্যোগ নেওয়া যায়।

ফিটনেস ছাড়া গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না, এটা ছাত্রদের দাবি। এটা তো আমাদের আইনেই আছে। যেমন তাদের আরেকটা দাবিও আইনে আছে, এর প্রয়োগ নিশ্চিত করাটা এখনকার করণীয়-লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। যেমন যাবে না বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘আমাদের কোমলমতি শিশু, তরুণেরা যা করেছে, তাকে স্যালুট। তারা ট্রাফিক সপ্তাহে সহায়তা করতে চাইলে তাদের স্বাগত। তারা পুলিশের নৈতিক ভিতকে জাগিয়ে তুলেছে, অনেক শক্তিশালী করেছে, চোখ-কান খুলে দিয়েছে। তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে এখন তাদের ঘরে যাওয়া উচিত।’
অকারণে সময়ক্ষেপণ করা হলো। এই দাবিগুলো যে মেনে নেওয়া হয়েছে, তার একটা সুস্পষ্ট ঘোষণা আরও আগেই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া উচিত ছিল। একটা প্রজ্ঞাপন জারি করে দাবি মানার ঘোষণাটাকে একটা দালিলিক রূপ দেওয়া যেত।
কিন্তু সহজ সমাধানের পথ নেওয়া হলো না। কালক্ষেপণের কৌশল নেওয়া হলো। সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হলো। স্থানে স্থানে সরকারি অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা লাঠিসোঁটা হাতে চড়াও হলো শিশু-কিশোরদের ওপরে। রক্ত ঝরল।
এই শঙ্কাটাই আমরা প্রকাশ করছিলাম। ‘প্রধানমন্ত্রী, সন্তানদের কথা শুনুন’ শীর্ষক লেখায় বলেছিলাম, ‘বলপ্রয়োগ সমস্যাকে বাড়াবে। কালক্ষেপণ সুযোগসন্ধানীদের ফায়দা নেওয়ার অবকাশ দেবে।’
একটা করে মুহূর্ত গড়িয়ে যাচ্ছে, আর পরিস্থিতি জটিল থেকে কঠিন হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে দেশকে স্বাভাবিক করতে কেউ এগিয়ে আসছেন না কেন? কারও কোনো দায় নেই? শিশু-কিশোরেরা রাস্তায়; প্রতিমুহূর্তে বুক কাঁপে অমঙ্গল আশঙ্কায়, শিশুদের না জানি কী ক্ষতি হয়! সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ, কত মানুষের কত কষ্ট হচ্ছে। ঢাকার রাস্তায় চলাচল অনিশ্চিত, বস্তুত দেশটা থেমে আছে, সেটা নিরসনে সরকার এগিয়ে আসবে না? কারও কোনো দায় নেই, দায়িত্ব নেই?
অথচ সমস্যার সুন্দর একটা সমাধান মোটেও কঠিন ছিল না, যখন সবাই বলছেন, দাবিগুলো যৌক্তিক, আর শিশু-কিশোরদের এই জাগরণ একটা চমৎকার উদাহরণ, বড়দের জন্য একটা শিক্ষা।
দায়িত্বশীল কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেবেন, দাবি পূরণের পদক্ষেপগুলো জানাবেন। প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ঘরে আর শিক্ষায়তনে ফিরে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রধানমন্ত্রী দাবি মেনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
শিশু-কিশোরেরা আমাদের অনেক বড় শিক্ষা দিতে পেরেছে। আমাদের গাড়িগুলোর যে ফিটনেস নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই, সেসব আমরা জেনে গেছি। শিশু-কিশোরেরা আমাদের বিবেককে অনেক বড় ধাক্কা দিতে পেরেছে। এবার তাদের নিরাপদে ঘরে ফেরানোটাই আমাদের এক নম্বর দায়িত্ব।
পরিবহন সেক্টরের অব্যবস্থা অবর্ণনীয়। এটাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে জরুরি ভিত্তিতে বড় এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে গত জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া পাঁচ নির্দেশনাই বাস্তবায়িত হয়নি, প্রথম আলোয় এ খবর পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেছি।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটা আশু ইতিবাচক উপসংহার চাই। দেখতে চাই, আমাদের শিশু-কিশোরেরা নিরাপদে ঘরে আর স্কুল-কলেজে ফিরে এসেছে, তাদের মুখে দেশের জন্য কিছু একটা অর্জন করার হাসি। সরকারও তাদের যেন হাসিমুখে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারে।
পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। যত দেরি হবে, তত ক্ষতি। এই ক্ষতি অর্থনীতির, নৈতিকতার, রাজনীতির এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তার। সরকার দ্রুত দাবি মানুক, ছাত্ররা দ্রুত ঘরে ফিরুক। এ জন্য চাই সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার সুস্পষ্ট আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং প্রজ্ঞাপন।

About জানাও.কম

Check Also

ড: কামাল সাহেব শেখ হাসিনার সাথে কোয়ালিশন করলে ভালো হবে!

লেখক চাদঁগাজীঃ ড: কামাল হোসেন মরা ঘোড়ার উপর বাজি রেখেছেন, ফলাফল কারো জন্য ভালো হবে …

মন্তব্য করুন