Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / রক্তগঙ্গা সৃষ্টির হুঁশিয়ারি

রক্তগঙ্গা সৃষ্টির হুঁশিয়ারি


শ্রীলঙ্কার চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হওয়ার পথে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে বলেছেন, শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপিত না হলে এই সঙ্কট থেকে ‘রক্তগঙ্গা’ তৈরি হবে।

গত সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা মন্ত্রীসভা বাতিল করেছেন। পার্লামেন্ট স্থগিত করেছেন। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে তাকে বহিষ্কারের আদেশ মানছেন না। এই সপ্তাহে বহিষ্কৃত তেলমন্ত্রী অর্জুনা রানাতুঙ্গার দেহরক্ষীর গুলিতে তার কার্যালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের একজন মারা গেছেন।

সোমবার পুলিশ অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে। ৫৪ বছর বয়সী রানাতুঙ্গা দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। তিনি বিক্রমাসিংহের মিত্র।

বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন থেকে অভিযোগ করা হয়, তার নির্দেশেই তার দেহরক্ষী ওই প্রতিবাদকারীর ওপর গুলি চালান। এরপর রানাতুঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি পরে জামিনে মুক্তি পান। তার দেহরক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তও চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করে নিজেরই সাবেক প্রতিপক্ষ রাজাপাকসেকে তার স্থলাভিষিক্ত করার যে সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা নিয়েছেন তা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহের দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রেখেছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও। চীন ইতিমধ্যে রাজাপাকসেকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে ভারত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র সংবিধান সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট স্পিকার কারু জয়সুরিয়া প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার প্রতি পার্লামেন্ট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের উচিত এই সমস্যা পার্লামেন্টের মাধ্যমে সমাধান করা। কিন্তু আমরা যদি একে রাজপথে নিয়ে যাই, তাহলে কিন্তু রক্তগঙ্গা বইবে।’

প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহেকে বহিষ্কারের ফলে দেশে কার্যত এখন সরকারের দাবিদার দু’জন। বিক্রমাসিংহে নিজের বাসভবন থেকে সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অপরদিকে প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আপাতত বিক্রমাসিংহেকে আরও সময় দেওয়া হচ্ছে।

সিরিসেনাও নতুন মন্ত্রীসভা নিয়োগ দিয়েছেন। রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়াও অর্থমন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়েছে। বিক্রমাসিংহের মিত্র বলে পরিচিত ৪ এমপিকে মন্ত্রী পদ দেওয়া হয়েছে দৃশ্যত তাদের সমর্থন লাভের আশায়।

রাজাপাকসে নিজে জনপ্রিয়, তবে বিতর্কিতও বটে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি ২০০৯ সালে দশকব্যাপী চলা গৃহযুদ্ধের ইতি ঘটিয়েছিলেন। তবে তিনি যে উপায়ে এই বিজয় লাভ করেন, তা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ধারণা করা হয়, গৃহযুদ্ধের শেষের কয়েক মাস হাজার হাজার বেসামরিক তামিল নিহত হয় সরকারি বাহিনীর হাতে।

তিনি চীনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৃহৎ অবকাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যার ফলে শ্রীলঙ্কা এখন কয়েকশ’ কোটি ডলারের ঋণের ফাঁদে জর্জরিত। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠ লোকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

রাজাপাকসে এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় অনেক শ্রীলঙ্কানই উদ্বিগ্ন যে তার পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করে দায়ের করা দুর্নীতি মামলার এখন কী হবে। এছাড়া রাজাপাকসের ১০ বছরের শাসনামলে সাংবাদিক সহ অন্যদের হত্যাকা-ের তদন্তেরই বা কী হবে?
সিরিসেনা কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ চাল চাললেন?

বিক্রমাসিংহে ২০১৫ সালে সিরিসেনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করেন। সিরিসেনা সেবার রাজাপাকসের বিরুদ্ধে জয় পান। কিন্তু ভারতের কাছে একটি বন্দর ইজারা দেওয়ার যে পরিকল্পনা হাতে নেয় বিক্রমাসিংহের সরকার, তা নিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে বাদানুবাদ হয়।

শনিবার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা বলেছেন, নীতিগত ইস্যুতে বিক্রমাসিংহের সঙ্গে তার মতপার্থক্য ছিল অনেক। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বন্ড বিক্রির এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পেছনেও বিক্রমাসিংহে ছিলেন বলে দাবি করেন প্রেসিডেন্ট। ওই বন্ড বিক্রির কারণে ১১০০ কোটি শ্রীলঙ্কান রুপির ক্ষতি হয় সরকারের।

প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, তাকে হত্যার একটি তদন্তে যুক্ত ছিলেন মন্ত্রীসভার এক সদস্য। এমনকি পুলিশ ওই হত্যাকা-ের তদন্তে বিঘœ ঘটাচ্ছিল। সিরিসেনা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এ সবকিছুর কারণেই রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াটাই ছিল একমাত্র বিকল্প।
এদিকে রাজাপাকসের সমর্থকরা শ্রীলঙ্কান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে নিয়েছে। স্পিকার জয়সুরিয়া বলেছেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া হবে গুরুতর।

রাজাপাকসের দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন। এই ট্রেড ইউনিয়নগুলো বিক্রমাসিংহের দলের মন্ত্রীদের কাছে কাউকে যেতে দিচ্ছে না। এদিকে বিক্রমাসিংহের শ’ শ’ সমর্থক জড়ো হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে, যেখানে তিনি থাকছেন।

বিক্রমাসিংহে ও তার দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) ক্ষমতায় আসে মূলত গৃহযুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা ও রাজাপাকসের শাসনামলের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ২৬ বছরের ওই গৃহযুদ্ধে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সরকার ও তামিল বিদ্রোহী উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগ রয়েছে।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন