বৃহস্পতিবার , মে 23 2019
Breaking News

বৃহন্নলা-কথন

মৌরি হক দোলা : সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে আমাদের প্রধানত দুইটি জাতি হিসেবে পাঠিয়েছেন- নর ও নারী। কিন্তু রহস্যময় তিনিই আরো এক গোষ্ঠীকে আমাদের সাথেই এই ধরণীতে পাঠিয়েছেন, যাকে আমরা চিনি সাধারণত তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে, শুদ্ধ বাংলায় যাদেরকে বলা হয় ‘বৃহন্নলা’। এই সুন্দর পৃথিবীতে আগমনের প্রক্রিয়া- নারী, পুরুষ কিংবা এই বৃহন্নলা গোষ্ঠীর- সম্পূর্ণ একই। সেই একই মাতৃজঠর। আমাদের নারী ও পুরুষ- প্রত্যেকের যেমন বাবা-মা রয়েছেন, তেমন এই বৃহন্নলা গোষ্ঠীও কিন্তু দুটি মানুষের মাধ্যমেই এসেছেন, যারাও বাবা এবং মা।

কিন্তু অদ্ভুত লাগে! একই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি আমরা। সবাই মানুষ। কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রা কতটাই না ভিন্ন। প্রত্যেকটি নারী ও পুরুষ সমাজে বেড়ে উঠছে, পড়াশোনা শিখছে, চাকরি-বাকরি করছে….এরপর ঘর-সংসার, সন্তান……সবই চক্রাকারে একইভাবে যুগের পর যুগ ধরে হয়ে আসছে। কিন্তু আমাদেরই মানবগোষ্ঠীর আরেকটা অংশ- বৃহন্নলাগোষ্ঠী? তারা একটা আলাদা সমাজের বাসিন্দা। তারা একটা আলাদা জীবনের স্বত্ত্বাধিকারী।

ছোট থেকেই চলতে ফিরতে এদের দেখা পাই। একটা সময় ছিল…..এদের দেখলে আমার কেমন বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করত। কখন কোথায় কিভাবে পালিয়ে বাঁচব এই ভাবতে ভাবতে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত প্রায়। আবার এরা সামনে পরলে সামনে বা পেছনে ছুটে দৌড় দেওয়ারও সাহস পেতাম না। যদি উল্টোপাল্টা বলে? যদি মারে? এক প্রকার বাঘের মতো ভয় পেতাম!

এখন বড় হয়েছি। বুঝতে শিখেছি, এরা বাঘ বা বাঘের ন্যায় কিছু না। এরা আমাদের মতোই মানুষ। এদেরও আমাদের মতো একটা মন আছে। এরা যেহেতু মানুষ, তাই নিশ্চয়ই এদের মাঝেও মানবতা বোধ আছে। এদেরও আছে আমাদের মতোই সুখ-দুঃখবোধ, ভালোলাগা-কষ্ট পাওয়ার অনুভুতি, একটু স্নেহ পাওয়ার আকাঙ্খা।

পাশের ঘরে নতুন ভাগ্নে এসেছে এক মাসের কিছু বেশি সময় হল। এই বৃহন্নলাগোষ্ঠী যেহেতু নতুন কোনো মানব শিশুর আগমনের সংবাদ শুনলেই চলে আসে সেই বাড়িতে, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা গতকাল সকালে আমাদের বাসায় এসে হাজির হল। কোথায়, কিভাবে খোঁজ পেল সেটি অজানা। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষগুলোকে আমি আর এখন বোকার মতো ভয় পাই না। নাস্তা করে বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম তাদের নাচ দেখতে। আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের পরে তাদের নাচ দেখিয়েছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে (ভয়ে)। মনে পড়ে তখন তাদের বেশ আড়ম্বর ছিল। একটা অন্যরকম আমেজ ছিল। সে আমেজ দেখতে পেলাম এখন অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। একটা গানে নাচল কি নাচল না……. বড় কথা সেই দিনগুলো আর খুঁজে পেলাম না কাল সকালে।

তাদের দেখতে পেয়েই আপু তার ছেলেকে নিয়ে প্রথমে ভয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। তখন শুনতে পেয়েছিলাম তারা বেশকয়েকবারই বলছেন, ‘আমাগো দেইখা ভয় পাইলি? দুয়ার দিলি? এইডা একটা কাম করলি ছেমড়ি? হ্যাঁ? আমরা কি তোগো্ মতন মার প্যাটের তন আহি নাই? আল্লায় আমাগো মা হওয়ার ক্ষমতা দেয় নাই, হের লিগা কি আমাগো কেউ জন্ম দেয় নাই?’

একবার না, তারা বেশ কয়েকবারই এই কথাগুলো বলেছিল। আমার কানে এসে বারবার জানান দিচ্ছিল আর কেমন যেন বুকের মধ্যে বিধছিল। চরম সত্য কথা। এরা আমাদের মতোই মানুষ। আমরা এই পৃথিবীতে যেভাবে এসেছি, তারাও ঠিক সেভাবেই এসেছে। তাহলে কেন তাদের জীবনধারা আর আমাদের জীবনধারা আলাদা ? কেন তাদের বাবা মাও আমাদের মতো করেই তাদেরও বুকের মধ্যে আগলে রাখেন না? লেখাপড়া শেখান না? কেন তাদের আলাদা জীবন যাপনে পাঠিয়ে দেন?

একবার শুনেছিলাম, এখন না কি অনেক বৃহন্নলাই লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। এই চিত্রটা কি একজন, দুইজন বা কয়েকজন বৃহন্নলার জীবনের চিত্র না হয়ে সকল বৃহন্নলার জীবনের চিত্র হতে পারে না? তারা কি আমাদের মতোই তাদের বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারে না? তাদের বাবা-মায়েরা কি পারে না, তাদেরকেও নিজেদের বুকে আগলে রাখতে? মানব জাতির তিনটি ভাগ- নর, নারী, বৃহন্নলা………..এই ভাবে কি ভাবা যায় না? আমরা কি পারি না তাদেরকে আমাদের মতোই স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে???………

About janaadmin517

Check Also

সুশিক্ষিত আসলে কাদের হওয়া উচিত? ভন্ডামি আসলে কাদের ছাড়া উচিত ? লজ্জা আসলে কাদের পাওয়া উচিত ?

জিপসি রুদ্র: গণতন্ত্রের মূল বিষয় হইলো, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগন । এই জনগন থেকেই জন প্রতিনিধি …

মন্তব্য করুন