Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / উপন্যাস / গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলা সহিত্যের সেরা উপন্যাসিক যারা

গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলা সহিত্যের সেরা উপন্যাসিক যারা


কালের বিবর্তনে পাল্টে যায় অনেক কিছু। সাহিত্যের মাধ্যমে একটি ভাষারও অনেক কিছুই পাল্টে যায়। তবে কিছু লেখক তাদের লেখা দিয়ে সাহিত্যে পদচিহ্ন রেখে যায়। সাহিত্যের উপধারা উপন্যাসেও থাকে তেমন কিছু কিংবদন্তি। বাংলা সাহিত্যে গত অর্ধ-শতাব্দীতে পদচিহ্ন রেখে যাওয়া তেমনই সেরা কয়েকজন উপন্যাসিককে নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। চলুন জেনে আসা যাক-
৮. প্রচেত গুপ্ত

প্রচেত গুপ্ত
মনে করা হয়ে থাকে আধুনিক সাহিত্যিকদের মধ্যে সব থেকে সম্ভবনাময় লেখক প্রচেত গুপ্ত। ওনার লেখার মধ্যে যে খুব শব্দের কারিকুরি বা বিষয়ের অনন্যতা আছে তাতু নয়। তবে ওনার লেখার বিশেষত্ব হলো, সাধারণ ঘটনাগুলিকে খুব সাধারণ শব্দে বর্ণনাও উনার লেখার গুনে অসাধারণ মনে হয়।
আমাদের রোজকার জীবনের ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা গুলোকে উনি খুব অন্যরকম ভাবে বর্ণনা করতে পারেন। ওনার লেখা পড়ার পর মনে হবে যেন আমাদের রোজকার জীবনেও এত ভালো ভালো ঘটনা ঘটে কখনো খেয়াল করিনি।
আর পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা হাসি চলে আসে। প্রচেত গুপ্তর প্রথম উপন্যাস ‘আমার যা আছে’ ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দলোক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম শিশুদের জন্য লেখা উপন্যাস ‘লাল রঙের চুড়ি’ একই বছরে আনন্দমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল।
৭. শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের প্রিন্স বলা হয় তাকে। অনুকূল ঠাকুরের প্রতি উনার অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধা কখনো কখনো ওনার লেখায় একটু ছাপ ফেলেছে কিন্তু তা সত্ত্বেও ওনার লেখা বেশ কিছু উপন্যাস (ঘুণপোকা, দূরবীন, পার্থিব) বাংলা সাহিত্যের এক একটি ক্লাসিক। তবে ওনার লেখার যে স্টাইল ওনাকে সকলের থেকে আলাদা করেছে তা হলো ওনার জীবনবোধ, রসবোধ এবং অবশ্যই ভূত।
ওনার সমস্ত চরিত্র ই জীবনটাকে খুব সরল আর খুব গভীর ভাবে দেখে। তা পাঠক দের ও জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আর শীর্ষেন্দুর কথা হবে আর ভূতের কথা হবে না, তা কি হয়? বাঙালির এক ও অদ্বিতীয় ভুত বিশেষজ্ঞ হলেন শীর্ষেন্দু।
ওনার গল্পের মতো অত রঙের আর অত রূপের ভুত আর কোথাও খুঁজে পাবেন না। তার প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে ঐ একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে ঘুণ পোকা নামক তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তার প্রথম উপন্যাস মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
৬. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যের সেরা অলরাউন্ডার হলেন সুনীল। কেউ কেউ মজা করে বলে, গদ্য, পদ্য, মদ্য সবেতেই সুনীল অদ্বিতীয়। সুনীল ই বোধহয় বাংলা কবিতার শেষ সুপারস্টার। সত্যজিৎ-ঋত্বিকের মতো সুনীল-শক্তি ও বাঙালির চিরকালীন অহঙ্কার। তবে উপন্যাসিক সুনীল ও কিন্তু আমাদের একই রকম ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তার উপন্যাসের মাধ্যমে।
তার লেখায় যেমন পেয়েছি নীললোহিত এর রোমান্টসিজম তেমন ই পেয়েছি ইতিহাস আশ্রিত সেই সময়, পূর্ব – পশ্চিম ও প্রথম আলো। নানা দেশ ঘুরে বেড়িয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি যতো ভরে উঠেছে , তাঁর লেখাও যেনো ততোই সমৃদ্ধ হয়েছে। একই ভাবে শিশু কিশোর দের জন্যও তিনি লিখে গেছেন নিরলসভাবে। তাঁর কাকাবাবু নিঃসন্ধেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা একটি চরিত্র। তিনি যেনো সত্যিকারের এক জীবনপ্রেমিক যিনি তাঁর নিজের জীবন কে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করেছেন। একই ভাবে পাঠকদের ও উৎসাহ যুগিয়েছেন জিবন টাকে পুরোপুরি ভাবে বাঁচার জন্য।
সুনীলের পিতা তাকে টেনিসনের একটা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন এখান থেকে দুটি করে কবিতা অনুবাদ করবে। এটা করা হয়েছিল এ জন্য যে তিনি যেন দুপুরে বাইরে যেতে না পারেন। তিনি তা-ই করতেন। বন্ধুরা যখন সিনেমা দেখত, বিড়ি ফুঁকত, সুনীল তখন পিতৃ-আজ্ঞা শিরোধার্য করে দুপুরে কবিতা অনুবাদ করতেন। অনুবাদ একঘেয়ে হয়ে উঠলে তিনিই নিজেই লিখতে শুরু করেন। ছেলেবেলার প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করা লেখা কবিতাটি তিনি দেশ পত্রিকায় পাঠালে তা ছাপা হয়।
৫. বিভূতভূষণ বন্দোপাধ্যায়

বিভূতভূষণ বন্দোপাধ্যায়
তাঁর সম্মন্ধে কিছু মানুষের একটু ভুল ধারণা আছে যে তিনি বুঝি গাছ-পালা, বাঁশবাগান, পুকুরপাড় আর জোছনা নিয়েই লেখা লিখি করেছেন। কিন্তু তাঁর লেখা পড়ার পর বোঝা যায় যে, তাঁর লেখার যে বিস্তার তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। পথের পাঁচালী নিয়ে কিছু বলার অবকাশ নেই, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা একটি ক্লাসিক।
আর আরণ্যক উনার প্রকৃতি প্রেমের একটি সেরা নিদর্শন। তবে তা ছাড়াও নিল চাষ এর পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস ইছামতী, পরকিয়া প্রেমের ওপর লেখা অথৈ জল, স্টার্ট-আপ ভেঞ্চার নিয়ে লেখা (:-)) আদর্শ হিন্দু হোটেল , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলকালীন দুর্ভিক্ষের সময় নিয়ে লেখা অশনি সংকেত বা পরলোক নিয়ে লেখা দেবযান ; ওনার সমস্ত লেখাই বাংলা সাহিত্যের এক একটি উজ্জ্বল রত্ন। আর চাঁদের পাহাড় যে বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কিশোর উপন্যাস তা নিয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই।
সেই সময়ে কেবলমাত্র কিছু ভ্রমণ কাহিনী পড়ে আফ্রিকার যে সাবলীল বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা শুধু বাংলায় নয় বিশ্ব সাহিত্যেও বিরল। শেষে তাঁর ছেলে তারাদাস বন্দোপাধ্যায় র একটা কথা দিয়ে শেষ করি। তিনি তাঁর বাবার উপন্যাস সমগ্র র ভূমিকায় লিখেছিলেন, “ এখনকার ছেলে মেয়েরা তো আর বই-টই বিশেষ পড়ে না। তারা প্রচুর পড়াশোনা করে আর তারপর প্রচুর মাইনের চাকরি করে। কিন্তু জীবনের কোমল দিক গুলি তাদের অচেনা ই থেকে যায়।”
৪. হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ
আধুনিক যুগের লেখকদের মধ্যে একমাত্র রকস্টার যিনি অনায়াসে ফিল্ম স্টার বা ক্রীড়াবিদদের জনপ্রিয়তায় পেছনে ফেলতে পারেন। লেখা ছাড়া তার জীবন-যাপন ও যেন তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার বানানো নন্দন কানন নুহাশ পল্লী যাকে তিনি রাঙ্গিয়ে ছিলেন নিজের কল্পনার রঙে, বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে তা বাড়ী – সবই যেনো তাঁর চরিত্র কে আরও রঙিন করেছে।
তাঁর লেখায় যে খুব নতুন কোনো আঙ্গিক বা প্রেক্ষিত আছে তা কিন্তু না। সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনের ছোটো খাটো ঘটনা গুলো নিয়েই তার লেখা। কিন্তু তার মধ্যেও তিনি এমন ম্যাজিক তৈরি করতে পারতেন যা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
৩. মহাশ্বেতা দেবী

মহাশ্বেতা দেবী
মহাশ্বেতা দেবী ১০০টিরও বেশি উপন্যাস এবং ২০টিরও বেশি ছোটোগল্প সংকলন রচনা করেছেন। তিনি মূলত বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তবে সেই সব রচনার মধ্যে অনেকগুলি অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ঝাঁসির রানি ঝাঁসির রানির (লক্ষ্মীবাই) জীবনী অবলম্বনে রচিত।
এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। এই উপন্যাসটি রচনার আগে তিনি ঝাঁসি অঞ্চলে গিয়ে তাঁর রচনার উপাদান হিসেবে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে তথ্য ও লোকগীতি সংগ্রহ করে এনেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল হাজার চুরাশির মা, রুদালি, অরণ্যের অধিকার ইত্যাদি।
মহাশ্বেতা দেবী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় রাজ্যের আদিবাসী উপজাতিগুলির (বিশেষত লোধা ও শবর উপজাতি) অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করেছিলেন।
২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, “কী পশ্চিম বাংলা, কী বাংলাদেশ – সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক। ইলিয়াস-এর পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।” দায়বন্ধতা থেকেই তিনি পরম দরদে তুলে এনেছেন সমাজের নিচু তলার নিষ্পেশিত মানুষের শ্রেণী জীবন।
এনেছেন তাদের বিচিত্র জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, দুঃখ-আনন্দ, ক্ষোভ, সংস্কার, অনুভুতি, সংলাপ। যেন রাষ্ট্রের চরিত্র ও মানুষের গণসংগ্রামের মিথস্ক্রিয়া। ক্ষণজন্মা এই লেখক কখনোই সস্তা জনপ্রিতা বা বণিক বুদ্ধিতে লিখেন নি।
দু’টি উপন্যাস, পাঁচটি ছোট গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ গ্রন্থই তাঁর রচনা সম্ভার। তাঁর কালোত্তীর্ণ লেখা জন্ম-মৃত্যু নির্ধারিত জীবন অবলীলায় ছাড়িয়ে যায়। সমাজ বাস্তবতা, শ্রমজীবি মানুষের কথা বারবার ফিরে এসেছে। তার তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমুহের মধ্যে রয়েছে চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা।
১. শহীদুল জহির

শহীদুল জহির
শহীদুল জহির তার গল্পে জাদুবাস্তববাদী পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন। তিনি সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম প্রকাশিত গল্প “ভালবাসা”, যেখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রভাব স্পষ্ট। তার প্রথম ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে।
বলা হয় যে লাতিন আমেরিকার লেখকদের লেখার জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া তার লেখায় রয়েছে এবং তাকে বাংলাদেশের গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেস বলা হয়। তিনি স্বীকার করেছেন যে দুইজন সমসাময়িক ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দ্বারা তিনি প্রভাবিত। তার কিছু গল্পের কাহিনী মার্ক্সবাদের প্রভাব বহন করে।
তার অনেক গল্পে তিনি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেছেন। তিনি কিছু ইংরেজি গল্পও অনুবাদ করেছেন। তাঁর রচিত জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫), ও মুখের দিকে দেখি (২০০৬) উপন্যাসগুলোকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজন বলে বিবেচিত হয়।

About janaadmin517

Check Also

উল্টাসনে ঋ দর্শনে – বিদ্রোহী ভৃগু

ছবি কৃতজ্ঞতা: গুগল পাশে সরিয়ে রেখে গুম খুনের আতংক এসো ভালোবাসি ভুলে যাই সব শঙ্কা …

মন্তব্য করুন