মঙ্গলবার , ফেব্রুয়ারী 25 2020
Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / কবিতা / গীতিকবিতা প্রসঙ্গ

গীতিকবিতা প্রসঙ্গ


ছবিঃ কবি ও গীতিকার কাজী বর্ণাঢ্য

কাজী বর্ণাঢ্যঃ
আমি যেহেতু গান ও কবিতা একই সাথে রচনা করি তাই অনেক শিল্পরসিক বন্ধুরা কৌতুহলবশত একটা প্রশ্ন করেন। গান (গীতিকবিতা / গীতিকাব্য) ও কবিতার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে কিনা। উত্তরে বলি হ্যাঁ অবশ্যই আছে। পানি ও মদের মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, চিনি ও লবনের মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে তেমনই গান ও কবিতার মধ্যে কিছু সুক্ষতম পার্থক্য আছেই। আমি যখন কবিতা লিখি তখন আমার মন মস্তিষ্ক কবিতার জন্য প্রস্তুত থাকে। যেহেতু কবিতা শিল্পের মহত্তম শাখা তাই কবিতার শব্দ, কবিতার বাক্যবিন্যাস, কবিতায় ভাবকে প্রকাশের ভঙ্গিমা আমাকে কাব্য চিন্তায় মগ্ন করে তুলে। বহুপ্রাচীণ পন্ডিতদের মতে বেদকেই প্রথম কবিতা বা ছন্দ (পয়েটিক ফর্ম) আকারে লেখা হয়েছিলো। কবিতা ও গান হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে বিচরণ করছে। এসময়ের মধ্যে নানা পরীক্ষা নিরিক্ষার ফলে কবিতা ও গানের নানান বাঁক বদলও হয়েছে। সবকিছুকে মাথায় রেখেই লিখতে হয়। যখন গান লিখি গানের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে প্রস্তুত করে নিই। প্রাণের অন্তঃস্থল থেকে আবেগের কম্পন উঠাই। অনুভূতিগুলোকে সুরের মূর্ছনায় দুলিয়ে তুলি। গান রচনার ক্ষেত্রে আমার মাথায় সবসময় একটি ভাবনা কাজ করে। সংগীত হলো এমন এক শিল্প মাধ্যম যা ধারণ করে মানুষ বেঁচে থাকে, মানুষ স্বাপ্নিক হয়ে উঠে, ব্যাক্তিগত ও সামাজিক দুঃখবোধকে সুরের ইন্দ্রজালে রেখে কল্পনার আকাশে উড়তে থাকে। কারণ গানের লিরিকে থাকে সুললিত ভাবের বিন্যাস বা সহজ স্বতঃস্ফূর্ত সরল কথার সুনিপুণ গাঁথুনি। ধারণা করা হয় প্রায় ৫৫০০০বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম সংগীতের আবির্ভাব ঘটে। কবিতা সৃষ্টির আরো আগে থেকেই সুরের মহিমায় বেজে ওঠে গান। কোনো মানুষকেই সুরের শিক্ষা বা জ্ঞান দিতে হয় না। অবচেতন মনেই মানুষ সুরের কাছে আশ্রয় খুঁজে।

কবিতা ও গীতিকবিতা দুটি কখনোই এক না। গীতিকবিতার আঙ্গিকগত আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে যা কবিতার জন্য জরুরি নই। বাংলা গীতিকবিতায় সাধারণত ৪টি পর্ব থাকে আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ। কবিতা ও গীতিকবিতার যেমন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ তেমনই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে দুটিকে উপস্থাপনের সুনিপুণ কৌশল কবিকে রপ্ত করতে হয়। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। কবিতায় সুরারোপ করলে কখনো কখনো তা গান হতে পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি গানই প্রথমত কবিতা। যে কবিতায় গীতময়তা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি গানেই লুকিয়ে আছে চিত্রকল্প উপমা উৎপ্রেক্ষাসহ কবিতার যাবতীয় অলংকার রসবোধ। গীতিকবিতা বা গান সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত হয়। তারমানে এই না যে অন্য কোনো ছন্দে গীতিকবিতা রচনা হয় না। অক্ষরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও গীতিকবিতা রচনা হয় তবে সেটা খুব কম। গীতিকবিতায় অন্তমিল বাধ্যতামূলক। যদিও বর্তমানে দেখা যায় অন্তমিল ছাড়াও গীতময়তাকে প্রাধান্য দিয়ে গান বা গীতিকাব্য রচনা হচ্ছে প্রচুর। যুগ যুগ ধরেই শিল্পের সকল শাখাতেই নিরিক্ষার মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তা কখনো টিকে আবার কখনো কালের আবর্তে তলিয়ে যায়। অন্তমিলহীন গীতিকাব্যের ভবিষ্যৎ কি এখানে এটা আলোচনার বিষয় না। কবিতার ক্ষেত্রে অন্তমিল না থাকলেও ভাবের পূর্ণ প্রকাশ পেলে শুদ্ধতার হানী হয় না। যন্ত্রের সাহায্যে কণ্ঠে তোলবার আগে গানকে বলা হয় গীতিকবিতা বা গীতিকাব্য। অর্থাৎ যে কবিতা গানের মতো করে সুর দিয়ে গাওয়া যায়, যে কবিতা সরল গীতময় এবং কোনো প্রকার সুর ছাড়াও কবিতার মতো পাঠ করা যায়। তাই গীতিকবিতা হয়ে উঠে একই সাথে গান ও কবিতা। গীতিকার প্রথমত কবি কারণ কবিতা রচনার সকল আবেগ জ্ঞান অর্জন করে পরবর্তীতে তিনি গীতল বা সুরেলা ঢংয়ে কবিতাকে পরিবেশনের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে থাকেন।

আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রথম গীতিকবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে ‘ভোরের পাখি’ আখ্যায়িত করেছেন। তিনি কবিতার মধ্যে সুর সৃষ্টির যে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন তা পরবর্তী সময়ে অনেককেই নানাভাবে প্রভাবিত করে তুলেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারা পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। এবং নিবিড় চর্চার মাধ্যমে গীতিকবিতার ধারা চালু করেন। সহজ সরল ভাষা বিন্যাস ও গীতময়তার উপস্থিতিতে তার কবিতা পেয়েছে আলাদা মাত্রা। বিহারীলাল চক্রবর্তীর সব কবিতাই সহি গীতিকবিতা।

ইংরেজি সাহিত্যে গীতিকবিতাকে লিরিক (Lyric Poem) বলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন ‘কবিতা যেমন মনের ভাষা, সংগীতও তেমন ভাবের ভাষা’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন ‘বক্তার ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটন মাত্র যাহার উদ্দেশ্য সেই কাব্যই গীতিকাব্য।’ তারমানে গীতিকবিতার উল্লেখযোগ্য দিক হলো এখানে ব্যাক্তির আবেগ অনুভূতি প্রকাশ পাওয়া। ভাবের বৈচিত্র ও ছন্দের বৈচিত্রপূর্ণ প্রকাশ গীতিকবিতায় এমনভাবে নির্ধারিত হয় যাতে সুরেলা হয়।

সময়ের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও অনেকেই গান লিখেন তাই সকল নবীন গীতিকারদের জ্ঞাতার্থে বলবো একসময় গানে শুধু আবেগ অনুভূতি প্রকাশ হতো। সময় মানুষকে বদলে দিয়েছে, আবেগের পাশাপাশি মানুষ জ্ঞানের চাষবাসেও নিজেদের যুক্ত করছেন। বেশি বেশি গান শুনুন, গান সম্পর্কে জানুন। আপনার রচনা নিশ্চয়ই বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করবে।

About বার্তা সম্পাদক

মন্তব্য করুন