মঙ্গলবার , এপ্রিল 7 2020
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী রিপোর্ট

করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী রিপোর্ট

২০১৯–২০ করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী বলতে ২০১৯ সালের করোনা ভাইরাস ঘটিত ব্যাধির (COVID-19) উদ্ভব এবং এর দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার চলমান ঘটনাটিকে নির্দেশ করা হয়েছে। ব্যাধিটি একটি ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট হয়, যাকে ভাইরাসবিজ্ঞানীরা গুরুতর তীব্র শ্বাসকষ্টমূলক উপসর্গসমষ্টি-সংশ্লিষ্ট করোনাভাইরাস ২ বা সংক্ষেপে ২ নং সার্স করোনাভাইরাস (SARS-CoV-2) নামকরণ করেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে মধ্য চীনের হুপেই প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী (ও তৎকালীন চীনের ৭ম বৃহত্তম নগরী) উহান নগরীর কর্তৃপক্ষ এই নতুন ধরনের করোনাভাইরাসটি শনাক্ত করেন। সেসময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৪১ জন চীনা ব্যক্তির গুরুতর ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া) রোগ হয়েছিল এবং প্রথমদিকে তাদের রোগের কোনও পরিষ্কার কারণ বের করা যায়নি কিংবা প্রচলিত ভাইরাস নিরোধক চিকিৎসা দিয়ে তাদের সারিয়ে তোলা যায়নি। উহান নগরীর হুয়ানান সামুদ্রিক খাদ্যের পাইকারি বাজারে বিক্রিত কোনও প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে বাজারের দোকানদার ও ক্রেতাদের মধ্যে প্রথম ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটে বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে চীনা বিজ্ঞানীরা এই নতুন প্রকারের করোনাভাইরাসটি পরীক্ষাগারে আলাদা করে শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
২ নং সার্স করোনাভাইরাস প্রথমে প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হলেও বর্তমানে এটি বিবর্তিত হয়ে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম। ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেকগুলি দেশে মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাসটির সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। ভাইরাসটি দেহে সংক্রমিত হবার পরে ২ থেকে ১৪ দিন সুপ্তাবস্থায় থাকতে পারে এবং এ সময় বাহকের অগোচরে এটি অপর কোনও ব্যক্তির দেহে সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাসটির সংক্রমণের ফলে যে ব্যাধিটি হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার নাম দিয়েছে ২০১৯ সালের করোনাভাইরাসঘটিত ব্যাধি। এই ব্যাধির উপসর্গগুলির মধ্যে আছে জ্বর, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, পেশীতে ব্যথা ও অবসাদগ্রস্ততা। সঠিক সময়ে সেবা-শুশ্রুষা না পেলে ব্যাধিটি জটিল আকার ধারণ করে, যার ফলে ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া), তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গসমষ্টি, রক্তে জীবাণুদূষণরোধী তীব্র অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (সেপসিস) ও জীবাণুদূষণজনিত অভ্যাঘাত (সেপটিক শক) হতে পারে এবং পরিশেষে মৃত্যুও হতে পারে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০১৯ সালের করোনাভাইরাসঘটিত ব্যাধির কোনও প্রতিরোধক টিকা কিংবা কার্যকরী প্রতিষেধক চিকিৎসা ছিল না। হাসপাতালে মূলত রোগীদের উপসর্গ উপশম করার চেষ্টা করা হয়।
প্রথম দিকে ভাইরাসটির বিস্তারের হার কম হলেও ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যভাগে এসে এটির সংক্রমণের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করে। ১৩ই মার্চ ২০২০ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও অধিক ব্যক্তি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। চীনের সবগুলি প্রদেশে বা প্রাদেশিক-স্তরের প্রশাসনিক বিভাগে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে দাপ্তরিকভাবে প্রকাশিত সংখ্যার বাইরেও আরও বহু লোকের দেহে ভাইরাসটির সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে, যাদেরকে এখনও শনাক্ত করা হয়নি। চীনের বাইরে ১২১টি রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। ২০২০ সালের ৯ই জানুয়ারি ভাইরাসটির কারণে প্রথম ব্যক্তিটির মৃত্যু হয় এবং তার পরে ১৩ই মার্চ ২০২০ তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৯৯০ জন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়া ৭০,৩৯৫ জন ব্যক্তি আরোগ্যলাভ করেছে। ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে সার্স করোনাভাইরাস-২-এর কারণে মৃতের সংখ্যা ২০০৩ সালের প্রথম সার্স ভাইরাসের কারণে মৃতের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে সামগ্রিকভাবে মৃত্যুর হার ছিল ২.২%, তবে হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার আরও বেশি।
চীনে ও বিশ্বজুড়ে সার্স করোনাভাইরাস-২-এর বিস্তার রোধের জন্য জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষসমূহ প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। চীনা সরকার অভ্যন্তরীণ আন্তঃনগরী ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, ঘরের বাইরে বের হওয়ার উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং সঙ্গনিরোধের ব্যবস্থা (কুয়ারেন্টিন) করেছে। এতে চীনের প্রায় ১৭ কোটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের বেশ কিছু দেশ উহান নগরী, হুপেই প্রদেশ এমনকি চীনদেশে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতামূলক বার্তা প্রকাশ করেছে। যেসব পর্যটক সম্প্রতি চীনের মূল ভূখণ্ড পরিদর্শন করেছে, তাদেরকে দেশে ফেরত আসার পরে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ স্বাস্থ্যের উপরে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। যদি কোনও ব্যক্তির সন্দেহ হয় যে সে করোনাভাইরাস বহন করছে, তাহলে তাকে বিশেষ চিকিৎসা-মুখোশ পরিধান করতে ও নিকটস্থ চিকিৎসকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং স্বশরীরে কোনও হাসপাতাল বা ক্লিনিকে (বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাকেন্দ্র) যেতে মানা করা হয়েছে। চীনসহ আরও বেশ কিছু দেশের বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনগুলিতে দেহের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কবাণী স্পিকারে সম্প্রচার করা হচ্ছে ও সতর্কতামূলক তথ্য প্রদানকারী নির্দেশফলক (সাইনবোর্ড) স্থাপন করা হয়েছে।
৩০শে জানুয়ারি ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালের করোনাভাইরাসঘটিত ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ও তৎপরবর্তীকালে এর মহাবিস্তারকে জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক গুরুত্ববিশিষ্ট জরুরী অবস্থা (Public Health Emergency of International Concern; PHEIC) হিসেবে ঘোষণা দেয়। যেসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সেসব দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে সম্ভাব্য ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বা মহামারীর কথা চিন্তা করে এই ঘোষণাটি দেওয়া হয়। এছাড়া আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক গণমাধ্যমগুলির সুবাদে সার্স করোনাভাইরাস-২ সংক্রান্ত উপকারী তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ভুল ও মিথ্যা তথ্য এমনকি আতঙ্ক-সৃষ্টিকারী গুজবের অতিদ্রুত বিস্তার ঘটেছে, যাকে “তথ্য মহাবিস্তার” (ইনফোডেমিক) নামে ডাকা হয়েছে। এর একটি নেতিবাচক ফল হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্থগিতকরণ বা বাতিলকরণ,ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় সেবা স্থগিতকরণ, বিশ্বের বেশ কিছু দেশে বিদেশীভীতি ও বিশেষত চীনাদের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষ, ভাইরাস সম্পর্কে ভুল তথ্য এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অনলাইনে বিস্তার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৯–২০ করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী

রোগ ২০১৯ সালের করোনাভাইরাসঘটিত ব্যাধি (COVID-19)
ভাইরাসের প্রজাতি গুরুতর তীব্র শ্বাসকষ্টমূলক উপসর্গসমষ্টি-সংশ্লিষ্ট করোনাভাইরাস ২ (SARS-CoV-2)
প্রথম সংক্রমণের ঘটনা ১লা ডিসেম্বর ২০১৯(৩ মাস ও ২ সপ্তাহ)
উৎপত্তি উহান নগরী, হুপেই প্রদেশ, চীন
নিশ্চিতকৃত ঘটনাসমূহ ২৪৬,০০০+
সুস্থ হয়েছে ৮৮,০০০+
মৃতের সংখ্যা ১০,০০০+
অঞ্চল ১৮০

ডাউনলোড করুন -করোনা আক্রান্ত অঞ্চল সমূহ

তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন