Breaking News
Home / পাঁচ-মিশালী / চিন্তা-চেতনা / শবে বরাতের গুরুত্ব ও আমাদের করণীয়

শবে বরাতের গুরুত্ব ও আমাদের করণীয়

এনামুল হক আরিফ॥ শবেবরাতের প্রকৃত নাম: এই রাতের নাম হাদীসের ভাষায় ‘লাইলাতুল নিসফ মিন শা’বান’ বা শা’বানের মধ্য রাত। আমরা এই রাতকে শবে বরাত কিংবা লাইলাতুল বরাত বলে থাকি। তিরমিজী, ইবনে মাজাহ ও সহীহ ইবনে হিব্বানে শবেবরাত সম্পর্কে হাদীস উদ্বৃত হয়েছে । ইমাম ইবনে হিব্বান বিশুদ্ধ সব হাদীস সহীহ ইবনে হিব্বানে চয়ন করেছেন।এ কিতাবে এই রাত্র সম্পর্কে আলোচনা এসেছে।চারজন বিখ্যাত ফেকাহর ইমামদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ইমাম আহমদ (রহ:)।তিনি হাদীসের যে গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন তার নাম হল ‘মুসনাদ’।সেই কিতাবেও এই রাত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে।আমরা পূর্বেই বলেছি হাদীসের গ্রন্থ সমূহে এই রাত্রকে লাইলাতুল বরাত কোথাও বলা হয়নি।এই রাত সম্পর্কে হাদিসে শিরোনাম ব্যবহৃত হয়েছে “শাবানের মধ্যরাত সম্পর্কে বর্ণনা”। আমাদের সমাজে এ রাতের প্রচলিত নাম হল ‘শবেবরাত’। ‘শব’ শব্দটি ফার্সি। অর্থ হল রাত। আর ‘বরাত’ মানে হচ্ছে বন্টন। কাজেই ‘শবেবরাত’ অর্থ দাঁড়ায় বন্টনের রাত।এ নাম জন সাধারনে বহুল প্রচলিত।শবেবরাতের গুরুত্ব এবং আমাদের করনীয়: এই রাতের গুরুত্ব, তাৎপর্য সম্পর্কে হযরত আয়শা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, এক রাতে আল্লাহর রাসুল আমার ঘরে থাকার কথা ছিল, রাতে তিনি আমার ঘরে শুয়েছেন। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আমি আশে পাশে অনেক খুঁজে দেখলাম যে, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বিছানায় নেই।আমি সন্দেহ করলাম, কি ব্যাপার, আল্লাহর রাসুল কি আজকে আমাকে ছেড়ে অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে চলে গেলেন? আজকের রাততো আমার হক্ব।জেনে রাখা দরকার, যাদের একাধিক স্ত্রী আছে তাঁদের সপ্তাহ কিংবা মাসকে প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য বরাদ্দ করতে হয়।যদি দু’জন থাকে, এক মাসকে দু’ভাগে ভাগ করতে হবে।১৫ দিন এক স্ত্রীর ঘরে, আর ১৫ দিন অন্য স্ত্রীর ঘরে।১৫ দিন তার ঘরে থাকা স্বামীর জন্য ওয়াজিব, থাকতেই হবে।শারীরিক সঙ্গম করুক বা না করুক কিন্তু থাকতে হবে।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, আজ রাত্রে তো আল্লাহর রাসুল আমার ঘরে থাকার কথা,তিনি কোথায়?রাসুলকে খোঁজার জন্য তিনি বের হয়ে গেলেন, বের হয়ে দেখলেন মসজিদে নববীর পার্শ্বে জান্নাতুল বাকী কবরস্থান, (যেখানে অসংখ্য সাহাবার কবর আছে) সেখানে তিনি দাঁড়িয়ে যিয়ারত করছেন।আল্লাহর রাসুল যখন টের পেলেন যে,হযরত আয়শা (রাঃ) এসেছেন,তখন তিনি আয়েশার সাথে কথা বললেন, জিজ্ঞাস করলেন,হে আয়েশা তোমার কি আশঙ্কা হয়েছে যে,আল্লাহর রাসুল তোমার উপর জুলুম করবেন? তোমার প্রাপ্য হক্ব নষ্ট হবে? জেনে রাখ আল্লাহর রাসুল কারো হক নষ্ট করতে পারেনা।কোন মানুষের উপর জুলুম করতে পারেনা।হে আয়েশা, আজকের রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন রাত।এই রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথম আসমানে অবতরন করেন, অর্থাৎ মাগরিব থেকে অল্লাহ রাব্বুল আলামীন রহমত নিয়ে বান্দাদেরকে প্রথম আসমানে আসেন।ফয়জুল কাদীর কিতাবে এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লেখক বলেন, আল্লাহ রহমতের দৃষ্টি বান্দাদের প্রতি নিবদ্ধ করার জন্য তার রহমত তিনি প্রেরন করেন।রাসূল সা. বলেন, হে আয়েশা! আল্লাহ তাআলা দয়া নিয়ে আজকের এই রাতে প্রথম আসমানে নাজিল হন এবং প্রচুর সংখ্যক মানুষের গোনাহকে ক্ষমা করেন।এজন্যেই আমি যারা কবরের মধ্যে শুয়ে আছে তাঁদের যিয়ারত করতে এসেছি। তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। এই হাদীস ইমাম তিরমিজী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, এই রাত হচ্ছে তাওবার রাত, এই রাত হচ্ছে আল্লাহর কাছে পাওয়ার রাত, চাওয়ার রাত। এই রাত হচ্ছে আল্লাহর দরবারে কাঁদার রাত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গোনাহ মাফ করার জন্য প্রস্তুত। আমাদের মাফ চাইতে হবে। শবে বরাতে যা যা করনীয়: আমরা শবে বরাতে ঘরে কিংবা মসজিদে নীরব জায়াগায় আল্লাহর দরবারে কান্নার চেষ্টা করব। কারণ, এই রাত হচ্ছে কান্নার রাত, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই রাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ক্ষমা করবেন। আর আমি যেন এই লক্ষ মানুষের বাহিরে না থাকি। আল্লাহ রহমতের চাদরে যেন আমি অন্তর্ভূক্ত থাকি। চাদরের বাহিরে যেন আমার স্থান না হয়। এ জন্য আল্লাহর কাছে কাঁদতে হবে। হাদীসে আছে মশার ডানা পরিমান অর্থাৎ এক কণা চোখ দিয়ে যদি পানি বের হয়ে ঝরে পড়ে যায় তাহলে সে চোখকে কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবেনা। অর্থাৎ সে লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিবেন।আসুন শবেবরাতে আমরা কাঁদি এবং দুআ করি, হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ তুমি মাবুদ, তুমি রহমান, তুমি রহীম, আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। এভাবে বলব আর কাঁদবো। আল্লাহর কাছে চাইব, নিজেকে ছোট করব, তাওবা করব। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বার বার বলেন,হে বান্দা তাওবা কর,ক্ষমা চাও,মাফ চাও,দুনিয়ার মানুষ মাফ চাইলে মাফ করতে পারেনা, কিন্তু আল্লাহ পাক বলেন: আমি মাফ করে দিতে প্রস্তুত।আমি রাহমানুর রাহীম। শবে বরাতে একটি বিশেষ আমল নামায: এ রাতে অধিক হারে নফল নামাজ আদায় করার চেষ্টা করা। দু’রাকাত নফল নামাজ যদি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় আমরা জান্নাতে যাওয়ার জন্য সে দু’রাকাতই যথেষ্ট হয়ে যাবে। বোখারী এবং মুসলিম শরীফের হাদীস- অর্থাৎ এমনভাবে তুমি এবাদত করবে আল্লাহকে যেন তুমি দেখছো। এতটুকু যেতে না পারলেও অন্তত মনে করবে যেন আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। আমি আল্লাহ তাআলার দরবারে দাঁড়িয়েছি শুরু থেকে সালাম ফিরানো পর্যন্ত পুরা দু’রাকাত নামাজে যদি আমাদের এই মনোভাব থাকে।অবশ্যই তিনি আমাদের নামাজ কবুল করবেন। বৎসরের প্রতি রাতেইতো আমরা ঘুমাচ্ছি। অন্তত কয়েকটি রাত, শা’বানের মধ্য রাত, কদরের রাত এবং দুই ঈদের রাত জাগ্রত থেকে পূর্নরাত এবাদত করে আল্লাহ দরবারে যদি কাটিয়ে দিই, তাহলে আমাদের কোন ক্ষতি হবেনা। কাজেই রাতে আমরা নামাজ পড়বো, এরপর সুন্দরভাবে শুদ্ধ করে কোরআন তেলওয়াত করবো। যখন জান্নাতের কথা আসবে ‘জান্নাত’ শব্দ আসবে তখন আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ করব, হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে জান্নাতের অধিকারী করে দাও। আর যখন জাহান্নাম শব্দ আসবে তখনও আল্লাহর কাছে বলব,হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দাও। এভাবে কোরআন কারীমের তেলাওয়াত করব।এরপর বেশি করে আল্লাহর নবীর উপর দুরুদ শরীফ পাঠ করব।একবার যে ব্যক্তি আল্লাহর নবীর উপর দুরুদ পাঠ করবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার উপর দশটি রহমত নাজিল কর।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন