Breaking News
Home / শিল্প-সাহিত্য / বাংলা ভাষায় প্রথম বিশ্বকোষের সংকলক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ নগেন্দ্রনাথ বসুর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

বাংলা ভাষায় প্রথম বিশ্বকোষের সংকলক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ নগেন্দ্রনাথ বসুর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী আজ


নূর মোহাম্মদ নূরুঃ বাংলা বিশ্বকোষের সংকলক নগেন্দ্রনাথ বসু। এছাড়াও তিনি হিন্দিতে প্রথম বিশ্বকোষের লেখক, পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ ছিলেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের সাধনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ২২ খণ্ডের বিশ্বকোষ রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে নিয়েছেন। বাংলা ও হিন্দি বিশ্বকোষের সংকলক, পুরাতত্ত্ববিদ, নাট্যকার, বহু ধ্রুপদী বাংলা বইয়ের সম্পাদক৷ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, তপস্বিনী, ভারত ও কায়্স্থ পত্রিকা সম্পাদনা করেন৷ তাঁর সংগৃহীত পুরনো পাণ্ডুলিপির সম্ভার নিয়ে শুরু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। প্রাচীন পুঁথি ও পুরাতত্ত্বের প্রতিও ছিল তার গভীর আকর্ষণ। সংগৃহীত তাম্রশাসন, শিলালিপি ও পুঁথির ভিত্তিতে ‘নাগরাক্ষর উৎপত্তি’ নামে একটি ঐতিহাসিক ও আকর্ষণীয় প্রবন্ধ লেখেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ খোলা হয়েছিল তার সংগৃহীত ব্যক্তিগত পুঁথি সম্বল করে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিষয়ে অসাধারণ অবদানের জন্য তাকে ‘প্রাচ্যবিদ্যা মহার্নব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পিতাম্বর দাসের ‘রসমঞ্জরী’, জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’, চণ্ডীদাসের অপ্রকাশিত ‘পদাবলী’সহ বেশ কিছু প্রাচীন গ্রন্থের সম্পাদনাও তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি। তবে ‘বিশ্বকোষ’ প্রণয়ন করে নগেন্দ্রনাথ বসু বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে বিখ্যাত হয়েছেন। সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণে তিনি প্রথম জীবনে ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। পরবর্তীসময়ে পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। বেশ কিছু কাব্যনাট্য ও নাটক রচনার পাশাপাশি শেঙপিয়রের ‘হ্যামলেট’ ও ‘ম্যাকবেথ’ অনুবাদ করেন। ‘শব্দেন্দু মহাকোষ’ নামে বাংলায় ও ইংরেজিতে অভিধান প্রকাশে তিনিই প্রথম সংকলকের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অপর অনন্য সৃষ্টি ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’। পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও পুঁথি সংগ্রহের জন্য তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণ করেছেন। আজ ইতিহাসবিদ নগেন্দ্রনাথ বসুর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৬৬ সালের আজকের দিনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা ভাষায় প্রথম বিশ্বকোষের সংকলক,প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ নগেন্দ্রনাথ বসুর জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নগেন্দ্রনাথ বসু ১৮৬৬ সালের ৬ জুলাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল হুগলির মাহেশে। প্রথম জীবনে নগেন্দ্রনাথ কবিতা ও উপন্যাস রচনায় ব্রতী হন। কিন্তু অল্পদিন পরেই তিনি সম্পাদনা কাজে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি তপস্বিনী ও ভারত নামে দুটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীকালে দীর্ঘকাল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি কায়স্থসভার কায়স্থ পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন। শুধু পত্রিকাই নয়, তিনি অনেক মূল্যবান প্রাচীন গ্রন্থও সম্পাদনা করেন, যেমন: পীতাম্বর দাসের রসমঞ্জরী, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, চন্ডীদাসের অপ্রকাশিত রচনাবলি, জয়নারায়ণের কাশী-পরিক্রমা, ভাগবতাচার্যের কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী প্রভৃতি। এগুলি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮৮৪ সালে নগেন্দ্রনাথ শব্দেন্দু মহাকোষ নামে একটি ইংরেজি-বাংলা অভিধান সংকলন ও প্রকাশ করেন। এ কাজের সূত্র ধরেই তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় আনন্দকৃষ্ণ বসু ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে এবং তাঁদের আগ্রহেই তিনি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য হন। ১৮৯৪ সালে বাংলার অনেক ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধাবলি তিনি এখানে উপস্থাপন করেন। নগেন্দ্রনাথ শব্দকল্পদ্রুমের পরিশিষ্ট সংকলনের কাজেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ হলো: বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (কয়েক খন্ড), কায়স্থের বর্ণপরিচয়, শূন্যপুরাণ, Archaeological Survey of Mayurbhanja, Modern Buddhism and its Followers in Orissa, Social History of Kamrup ইত্যাদি। নগেন্দ্রনাথ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেও তাঁর প্রধান পরিচয় বাংলা বিশ্বকোষ রচয়িতা হিসেবে। রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায়ের সংকলন এবং তাঁর ভ্রাতা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এর প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয়। পরে দীর্ঘ ২৭ বছরের পরিশ্রমে নগেন্দ্রনাথ বিশ্বকোষের ২২টি খন্ড প্রকাশ করেন। শেষ খন্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯১১ সালে। ১৯১৬-৩১ সালে ২৪ খন্ডে এর একটি হিন্দি সংস্করণও প্রকাশিত হয় এবং ১৯৩৩-৩৮ সালের মধ্যে বিশ্বকোষের দ্বিতীয় সংস্করণের চারটি খন্ড প্রকাশিত হয়।

গবেষণার পাশাপাশি নগেন্দ্রনাথ বসু নাটক রচনা ও অনুবাদের কাজও করেন। বিহারীলাল সরকারের আগ্রহে তিনি দর্জিপাড়া থিয়েট্রিক্যাল ক্লাবের জন্য শঙ্করাচার্য (১৮৮৮), পার্শ্বনাথ, হরিরাজ, লাউসেন প্রভৃতি গদ্যপদ্যময় কয়েকটি নাটক রচনা করেন। এছাড়া তিনি শেক্সপীয়রের হ্যামলেট এবং কর্ণবীর (১৮৮৪) নামে ম্যাকবেথ নাটকের বঙ্গানুবাদ করেন। নগেন্দ্রনাথ ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের স্তম্ভস্বরূপ। এছাড়া তিনি কায়স্থসভারও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ভারতীয় পুরাতত্ত্বে অসাধারণ গবেষণার জন্য তাঁকে তিনি “প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব” শিরোনামে ভূষিত হন। ১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসু। নগেন্দ্রনাথ বসুর কাজকে সন্মান জানিয়ে কলকাতা পৌরসংস্থা “বিশ্বকোষ” লেন নামে একটি রাস্তার নাম করণ করেছে। আজ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ নগেন্দ্রনাথ বসুর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী। প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসুর জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন