Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্প ও বাইডেনের অবস্থান কী

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্প ও বাইডেনের অবস্থান কী

জানাও ডেস্কঃ তেসরা নভেম্বর আমেরিকায় ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন আগামী চার বছর হোয়াইট হাউজে তারা কাকে দেখতে চান। তারা কি চান ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো চার বছরের জন্যে ক্ষমতায় থাকুক নাকি সেখানে তারা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনকে বসাতে চান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকার ইতিহাসে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে অনেক ব্যতিক্রম এবং প্রার্থীদের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক পটপরিবর্তন, তার সাথে দেশটিতে করোনাভাইরাস মহামারির মারাত্মক প্রকোপের কারণে বদলে গেছে অনেক হিসেব নিকাশ।

নভেম্বরের নির্বাচনে যেসব বিষয়ের ওপর বিচার বিশ্লেষণ করে ভোটাররা তাদের রায় দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে করোনাভাইরাস, চাকরি-বাকরি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র নীতি, অভিবাসন ইত্যাদি।

করোনাভাইরাস:

ডোনাল্ড ট্রাম্প: সারা বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুও হয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের।

মি. ট্রাম্প শুরু থেকেই করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখিয়েছেন। ভাইরাসটিকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এমনকি মহামারি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগের ব্যাপারেও তিনি বারবার বাধা দিয়েছেন। বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনাতেও তিনি কখনও কখনও মুখর হয়েছেন।

করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ।

জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও গোয়েন্দাদের সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু মার্চ মাসের পর থেকে ধীরে ধরে তার অবস্থানের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

তখন থেকে মহামারি মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে কিছু তৎপরতা শুরু হয়। বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া হয় পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।

জো বাইডেন: তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তার প্রথম কাজই হবে মহামারি মোকাবেলা করা।

এজন্য তিনি একটি জাতীয় পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। ফ্রি নমুনা পরীক্ষা, টেস্ট সহজলভ্য করা, কন্টাক্ট ট্রেসিং-এর জন্য এক লাখ কর্মী মোতায়েন, চিকিৎসা- এসবের জন্য সর্বোচ্চ খরচের ব্যাপারেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রত্যেক রাজ্যের গভর্নরকে তার এলাকার লোকজনের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও জোর দিয়েছেন তিনি।

ভবিষ্যতের যে কোন মহামারি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথাও বলেছেন জো বাইডেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে এই সঙ্কট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি বিশ্ব নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে আসবেন। তার প্রশাসন আবারও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দিয়ে মহামারি মোকাবেলায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা: আমেরিকা ফার্স্ট।

ডোনাল্ড ট্রাম্প: করোনাভাইরাসের কারণে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা মি. ট্রাম্পের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা সবকিছুতে আমেরিকা অগ্রাধিকার পাবে এই নীতির পক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা দীর্ঘ দিনের। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও চেষ্টা করেছেন।

আগের বারের নির্বাচনী প্রচারণায় মি. ট্রাম্প কর্মজীবী আমেরিকানদের কর হ্রাসের অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর। একই সাথে তিনি কল কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরেও জোর দিয়েছিলেন।

এসব প্রতিশ্রুতির কিছু কিছু তিনি পূরণও করেছেন। গত চার বছরে বাণিজ্য সংক্রান্ত আইন কানুনে পরিবর্তন এনেছেন, কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত আয়কর হ্রাস করেছেন এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাহী আদেশও জারি করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের পর থেকে চার লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, এই খাতে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে এবং মি. ট্রাম্পের নীতির কারণে তেমন মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন মহামারি শেষ হওয়ার সাথে সাথে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। যদিও সমালোচকরা বলছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তার গৃহীত পদক্ষেপের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জো বাইডেনের স্লোগান: বিল্ড ব্যাক বেটার।

জো বাইডেন: করোনাভাইরাসের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামাল দিতে যতো অর্থের প্রয়োজন ততো অর্থ খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মি. বাইডেন। এসবের মধ্যে রয়েছে ছোট খাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া এবং পরিবারগুলোকে নগদ অর্থ সাহায্য প্রদান।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবে প্রতি মাসে তিনি আরো ২০০ ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাব করেছেন, শিক্ষার্থীদের ১০,০০০ ডলার ঋণ মওকুফের।

তার অর্থনৈতিক নীতিমালার স্লোগান হচ্ছে: বিল্ড ব্যাক বেটার। এর মাধ্যমে মূলত তিনি তরুণ-তরুণী ও শ্রমজীবী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চাইছেন।

তিনি ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৫ ডলারে উন্নীত করতে চান। তরুণদের কাছে এই প্রচারণা খুবই জনপ্রিয়। আর একারণে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণায় এটিকে অন্যতম ইস্যু বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এছাড়াও পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানীর পেছনে দুই ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলেছেন তিনি।

আমেরিকান পণ্য ক্রয়ের জন্যেও তিনি ৪০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এসংক্রান্ত একটি আইনের (আমেরিকান পণ্য ক্রয় করুন বা ‘বাই আমেরিকান’) কথাও বলছেন।

উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নাফটাকে সমর্থন দেয়ায় এর আগে জো বাইডেনের সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে দেশের চাকরি-বাকরি বিদেশে চলে গেছে।

মি. বাইডেনের পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পণ্য, সেবা, গবেষণা ও প্রযুক্তির পেছনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাণিজ্য

ডোনাল্ড ট্রাম্প: চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের পণ্য টিকিয়ে রাখা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরো একটি নির্বাচনী স্লোগান।

তার কথা হলো, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার পর অন্য কিছু। তিনি বলেন, ‘আমেরিকা প্রথম’ এই কথার অর্থ এই নয় যে ‘আমেরিকা একা।’

বাণিজ্য ইস্যুতে মি. ট্রাম্প চীনের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের পণ্যকে রক্ষা করতে তিনি কিছু নীতিমালাও গ্রহণ করেছেন।

প্রথম মেয়াদে তিনি পুরনো কিছু বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে নতুন করে সমঝোতার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, এসব চুক্তি ভারসাম্যপূর্ণ নয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে নাফটা বা উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। তাই তিনি এই সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সরিয়ে নিয়েছেন ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশীপ বা টিপিপি থেকেও।

আগের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বাণিজ্য ঘাটতি (আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান) দূর করার ব্যাপারেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত ছয় বছরের মধ্যে এই ঘাটতি ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো হ্রাসও পেয়েছে। তবে এর ফলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে অর্থনীতিবিদরা সেটা মানতে রাজি নন।

চীন থেকে কারখানা সরিয়ে আনার ব্যাপারে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে অগাস্ট মাসে তিনি ট্যাক্স ক্রেডিট দেয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, “এর মাধ্যমে চীনের ওপর আমাদের নির্ভরতার অবসান ঘটবে।”

চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপরেও কর বসিয়েছেন মি. ট্রাম্প। এসবের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত থেকে শুরু করে ফরাসী ওয়াইন। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর কর আরোপেরও হুমকি দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি কানাডা থেকে অ্যালুমিনিয়াম পণ্য আমদানির ওপরেও নতুন করে কর আরোপ করেছেন।

জো বাইডেন: বাণিজ্যের ব্যাপারে মি. বাইডেন এক জটিল ও অনিশ্চিত অবস্থানে আছেন।

চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য একদিকে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আক্রমণ করছেন আবার অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট এই প্রার্থী চীনের ব্যাপারে নমনীয় ভূমিকাও দেখাতে চান না।

তিনি যে খুব বেশি মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে তাও প্রকাশ করতে চান না। আর এসব কারণেই তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রপন্থী এক বাণিজ্য কৌশলের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পররাষ্ট্র নীতি

ডোনাল্ড ট্রাম্প: শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই নয়, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান ‘আমেরিকা ফার্স্ট।’

হোয়াইট হাউজ এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয় এভাবে: যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুন-প্রতিষ্ঠা এবং প্রত্যেকটি দেশের যার যার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে কি এর অর্থ এরকমই?

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান আমেরিকা ফার্স্ট।

বাস্তবে যা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যারিস চুক্তি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়া।

ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকেও ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন।

এছাড়াও তিনি প্রতিরক্ষা জোট নেটোর মতো আন্তর্জাতিক কিছু জোট নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এর সদস্য দেশগুলোকে আরো বেশি অর্থ দিতে হবে।

বিদেশে মোতায়েন মার্কিন সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

তার সমালোচকরা বলছেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে মি. ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছেন।

পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে তার কিছু সাফল্যও আছে। সম্প্রতি ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে তিনি সহায়তা করেছেন।

ইসলামিক স্টেটের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি এবং ইরানের সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার ব্যাপারেও তার ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।

জো বাইডেন বলছেন প্রেসিডেন্ট হলে তিনি বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব পুন-প্রতিষ্ঠা করবেন।

জো বাইডেন: মি. বাইডেন বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি জাতীয় ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেবেন। তিনি বলেছেন, তার কোন পররাষ্ট্র নীতি নেই কিন্তু বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব পুন-প্রতিষ্ঠা করার জন্য তার একটি পরিকল্পনা আছে।

তার এই বক্তব্য থেকে এটা বলা যাবে না যে মি. বাইডেনের পররাষ্ট্র নীতি বিশ্ব পর্যায়ে ‘বহু দেশের অংশগ্রহণের নীতি’ থেকে দূরে সরে গেছে। কিন্তু মি. ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পক্ষে। মি. বাইডেন বলেছেন, তার কাজ হবে এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে আবারও আন্তর্জাতিক চুক্তি, পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তির সাথে সম্পর্ক মেরামতের কথাও বলেছেন জো বাইডেন। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা জোট নেটোর সঙ্গে।

সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীন পরিবেশের জন্যে চীনকে জবাবদিহি করতে হবে। তবে তিনি বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একটি আন্তর্জাতিক জোট করার কথা বলেছেন যা চীন উপেক্ষা করতে পারবে না।

তবে তার এই প্রস্তাবের অর্থ কী সেটা খুবই অস্পষ্ট।

অভিবাসন

ডোনাল্ড ট্রাম্প: মি. ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম একটি ভিত্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমিয়ে আনা।

এবারও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পুন-নির্বাচিত হলে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ অব্যাহত থাকবে। এখনও পর্যন্ত তিনি ৭২২ মাইল সীমান্তের মধ্যে ৪৪৫ মাইল প্রাচীর নির্মাণের অর্থ সংস্থান করতে পেরেছেন।

এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বসবাসরত অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদেরকে তাদের নিজেদের দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার নীতির অবসান ঘটানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মি. ট্রাম্প লটারি ভিসা পদ্ধতি বাতিল করে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিসা ব্যবস্থা চালু করার কথা বলেছেন।

অভিবাসন বিষয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থানের অনেক তফাৎ।

অভিবাসন নীতি সংস্কারে তার পরিকল্পনা সম্প্রতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চেয়েছিলেন এরকম একটি আইন বাতিল করতে যাতে শিশু বয়সে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা সাড়ে ছয় লাখ লোককে আশ্রয় দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের ওই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।

জো বাইডেন: মি. বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে নির্বাচিত হলে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত, যেগুলো তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জারি করেছিলেন, সেগুলো বাতিল করে দেবেন।

তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সীমান্তে শিশুদেরকে তাদের পিতামাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার নীতি। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চেয়ে আবেদনের সংখ্যার ওপর মি. ট্রাম্প যে সীমা বেঁধে দিয়েছেন সেটাও বাতিল করার কথা বলছেন তিনি। বলেছেন, বেশ কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে লোকজনের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার কথাও।

হোয়াইট হাউজে কে বসবেন – সিদ্ধান্ত হবে ৩রা নভেম্বর।

এছাড়াও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে শিশু বয়সে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা যেসব লোকজনকে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছিল তাদেরকেও রক্ষার কথা বলেছেন তিনি।

স্বাস্থ্য

ডোনাল্ড ট্রাম্প: সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার গৃহীত এক স্বাস্থ্য সেবা ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ যা ওবামা কেয়ার নামে পরিচিত সেটা বাতিল করার জন্য ২০১৬ সালে প্রচারণা চালিয়েছেন মি. ট্রাম্প।

পুরোপুরি বাতিল করতে ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প প্রশাসন এর কিছু কিছু অংশ প্রত্যাহার করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জুলাই মাসে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন যার ফলে বিদেশ থেকে কম মূল্যে ওষুধ আমদানি করা যাবে। তবে কোন কোন বিশ্লেষক বলছেন যে বাজারে এর তেমন একটা প্রভাব পড়বে না।

মি. ট্রাম্প অপিওয়েড ড্রাগ সমস্যাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য খাতে জরুরি অবস্থা বলে ঘোষণা করেছিলেন ২০১৭ সালে। এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে তিনি প্রায় দুশো কোটি ডলারের এক অর্থ তহবিলেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রোগের চিকিৎসায় অপিওয়েডকে প্রেসক্রাইব করা বন্ধ করতেও তিনি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামা কেয়ারের বিপক্ষে, পক্ষে জো বাইডেন।

কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ওবামা কেয়ার বাতিল করে দেয়া হলে এই ড্রাগ সমস্যা মোকাবেলা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

জো বাইডেন: মি. বাইডেন বলেছেন, ক্ষমতায় এলে তিনি স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প সম্প্রসারণ করবেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে তিনি যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন এই প্রকল্পটি গৃহীত হয়েছিল।

সকল আমেরিকানের ৯৭%কে এই ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

সবার জন্য তিনি মেডিকেয়ারের মতো স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন যাতে বয়স্ক মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবার কথা বলা হয়েছে।

একটি গবেষণা গ্রুপ বলছে, এজন্য আগামী ১০ বছরে মি. বাইডেনের খরচ হতে পারে সোয়া দুই ট্রিলিয়ন ডলার।

জলবায়ু পরিবর্তন

ডোনাল্ড ট্রাম্প: ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মি. ট্রাম্প পরিবেশ রক্ষাকারী বেশ কিছু বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে জ্বালানী কেন্দ্র ও যানবাহনের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের সীমা। আগের বারের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি এসবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে করা আন্তর্জাতিক প্যারিস চুক্তি থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তার যুক্তি হলো এই চুক্তি থেকে তার দেশ লাভবান হচ্ছে না, বরং অন্য দেশগুলো এথেকে সুবিধা নিচ্ছে।

প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে এই চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসার কাজ সম্পন্ন হবে নভেম্বরের নির্বাচনের পর।

অতি সম্প্রতি তিনি আলাস্কা আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ড-লাইফ রিফিউজে তেল ও গ্যাসের জন্যে ড্রিলিং-এর অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু পরিবেশের কথা বিবেচনা করে সেখানে এতদিন ড্রিলিং নিষিদ্ধ ছিলো।

জো বাইডেন: জলবায়ুর পরিবর্তনকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন জো বাইডেন। তিনি বলেছেন, কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনার জন্য তিনি সারা বিশ্বকে সাথে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

তার প্রথম কাজ হবে প্যারিস চুক্তিতে পুনরায় যোগ দেওয়া। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ২০২৫ সালের মধ্যে ২০০৫ সালের তুলনায় ২৮% কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তির গবেষণায় তিনি প্রায় পৌনে দুই ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি চান ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন শূন্যের মাত্রায় নামিয়ে আনতে। ২০১৯ সালে ৬০টিরও বেশি দেশের মধ্যে হওয়া এক সমঝোতায় এই অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

পরিবেশ দূষণকারী আরো দুটো বৃহৎ দেশ চীন এবং ভারত এখনও এই সমঝোতার পক্ষে সায় দেয়নি।

বর্ণবাদ ও ফৌজদারি বিচার

ডোনাল্ড ট্রাম্প: ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন মি. ট্রাম্প যাতে বিচারকদের বাড়তি কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

আগের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকা কালেও তিনি একই অবস্থানে ছিলেন। সম্প্রতি পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর সারা দেশে বর্ণবাদবিরোধী ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন শুরু হলে পুলিশের পক্ষে তার সমর্থন আরো জোরালো হয়।

কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আন্দোলনও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

জুন মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন যেখানে পুলিশ বাহিনীতে কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পুলিশের হাতে নির্যাতনের ঘটনার তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেইজ তৈরি করা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, সন্দেহভাজন কোন অপরাধীকে থামাতে তার গলা চেপে ধরা (যা চোকহোল্ড নামে পরিচিত) বন্ধ করতে হবে। তবে তিনি এর ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি।

জো বাইডেন: পুলিশের নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর সারা দেশে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মুখে মি. বাইডেন বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ আছে এবং বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

তার বিল্ড ব্যাক প্রোগ্রামের একটি বিষয় হচ্ছে ৩,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের জন্যে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা।

ফৌজদারি অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে তিনি তার আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ৯০-এর দশকে তার কথা ছিলো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।

কিন্তু এখন তিনি বর্ণবাদ, লিঙ্গ, আয় বৈষম্য, কারাগারে বন্দী থাকা এসব কমিয়ে আনা ও বন্দীদের মুক্তির পর তাদের পুনর্বাসনের জন্য বিচার ব্যবস্থায় কিছু নীতিমালা গ্রহণের প্রস্তাব করছেন।

মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করার কথাও বলেছেন তিনি।

মি. বাইডেন বলেছেন, পুলিশের কাজের মান বজায় রাখতে হলে এই বাহিনীর পেছনে অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

About জানাও.কম

মন্তব্য করুন